মঞ্চে নেই জোড়াফুল, নেই অভিষেকের ছবিও! শ্রীরামপুরে মমতার হাইভোল্টেজ সভায় হঠাৎ কী ঘটল?

১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে দীর্ঘ ২৮ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দৃশ্য হয়তো কেউ কখনো প্রত্যক্ষ করেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভা বা দলীয় মঞ্চ মানেই যেখানে অবধারিতভাবে শোভা পেত ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ চিহ্ন, শনিবার হুগলির শ্রীরামপুরের কোর্ট মাঠে দেখা গেল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোনো জোড়াফুল প্রতীক কিংবা ফেস্টুন ছাড়াই মঞ্চে উঠলেন তৃণমূল নেত্রী। এমনকি, দলীয় ব্যানার থেকে গায়েব ছিল সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিও!
হঠাৎ কেন এই নজিরবিহীন পরিবর্তন? মূল কারণ— নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক এক কড়া সিদ্ধান্ত। নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেস এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীক আপাতত ‘ফ্রিজ’ বা স্থগিত করে দিয়েছে। বর্তমানে কমিশনের খাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের নতুন দলীয় নাম ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং তাঁদের নির্বাচনী প্রতীক নির্ধারিত হয়েছে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’।
শ্রীরামপুরের জনসভা থেকে প্রতীক স্থগিত করা নিয়ে সরাসরি নির্বাচন কমিশন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “ওরা ভাবছে জোর করে আমাদের প্রতীকটা দখল করে নেবে। আমরা যেটা করব, সেটাই আমাদের প্রতীক হয়ে উঠবে। তুমি ততদিন ক্ষমতায় থাকবে তো? বাংলা জোর করে দখল করেছে, আর দিল্লিটা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে!”
মঞ্চের ব্যানারে জোড়াফুল না থাকা প্রসঙ্গে স্থানীয় প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদার জানান, নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। মামলাটি যেহেতু বিচারাধীন, তাই বর্তমানে সেই আইনি বাধ্যবাধকতা মেনেই বিতর্কিত প্রতীক ব্যবহার করা হয়নি।
তবে শুধু প্রতীক উধাও হওয়াই নয়, সভায় দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি না থাকা নিয়েও গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। সাধারণত যে কোনো বড় সভায় মমতা ও অভিষেকের ছবি পাশাপাশি রাখা বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। শ্রীরামপুরের মঞ্চে শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্থানীয় সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি জায়গা পাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অসিত মজুমদার স্পষ্ট জানান, “কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এখানকার স্থানীয় সাংসদ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সবার নেত্রী। একটি মঞ্চে বহু নেতৃত্ব উপস্থিত থাকেন, সবার ছবি দেওয়া সম্ভব নয়।”
উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার রাশ ও পরিষদীয় দলের নেতৃত্ব নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতা শিবিরের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়। দুই পক্ষই নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে দাবি করে কমিশনের কাছে আবেদন জানায়। বিবাদ না মেটায় উপ-নির্বাচনের মুখে কমিশন জোড়াফুল প্রতীকটি ফ্রিজ করে দেয় এবং ঋতব্রত-শিবিরকে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ (প্রতীক: খাম) ও মমতা-শিবিরকে নতুন নাম ও প্রতীক বরাদ্দ করে।
আইনি বিবাদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জোড়াফুল ছাড়াই রাজনৈতিক সভা করতে হবে। তবে দলীয় নির্দেশিকা যাই থাক না কেন, এদিন শ্রীরামপুরের মাঠজুড়ে উপচে পড়া সমর্থকদের হাতে কিন্তু সেই পুরানো ঘাসফুল আঁকা পতাকাই পতপত করে উড়তে দেখা গিয়েছে।