এআই, ড্রোন থেকে হাইপারসনিক অস্ত্র! ভবিষ্যতে যুদ্ধের মাঠ কাঁপাতে জলের দরে নয়, কোন মেগা ছকে এগোচ্ছে ভারতীয় সেনা?

বদলুটে যুদ্ধের আধুনিক কৌশল এবং চিন-পাকিস্তান সীমান্ত সংক্রান্ত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় নিজেদের যুদ্ধক্ষমতাকে অবিশ্বাস্য গতিতে আধুনিক করে তুলছে ভারতীয় সেনা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল ঐতিহ্যবাহী অস্ত্রের ওপর ভরসা না রেখে সেনার মূল ফোকাস এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI), ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন, অটোনমাস সিস্টেম, সাইবার, কোয়ান্টম, হাইপারসনিক এবং ডিরেক্টেড এনার্জি উইপনের মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগুলিকে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করার ওপর। সেনার অনুমান, আগামী দুই দশকের মধ্যে এই উন্নত প্রযুক্তিগুলিই যুদ্ধক্ষেত্রের সামগ্রিক কৌশল পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। আর সেই লক্ষ্যেই শত্রুদেশগুলিকে অপ্রস্তুত রাখতে অস্ত্র ক্রয় এবং আधुनिकीকরণ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ড্রোন এবং কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশেষ জোর:
সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর কৌশলগত শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে ইউএএস (UAS), কাউন্টার-ইউএএস, লোইটারিং মিউনিশনস, এয়ার ডিফেন্স এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমগুলিকে এখন সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দ্রুততম গতিতে এই প্রযুক্তিগুলি অর্জন করতে দেশীয় ও বিদেশি ডিফেন্স কোম্পানি, স্টার্টআপ এবং সরকারি সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন সংক্রান্ত জরুরি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি কোর কমিটি গঠনের পাশাপাশি বিশেষ পারপাস ভেহিক্যাল বা এসপিভি (SPV) তৈরির প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে। সেনার নিজস্ব গবেষণা ও দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়াতে ‘আদিতি’ ও ‘ডিস্ক’-এর অধীনে একাধিক ফাস্ট ট্র্যাক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট চালু করা হয়েছে।
নতুন সেনা বিন্যাস ও আক্রমণাত্মক শক্তি:
নতুন প্রজন্মের অস্ত্র ও ফোর্স মাল্টিপ্লায়ারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতীয় সেনা একাধিক নতুন কাঠামো বা ফরমেশন তৈরি করেছে। যেমন—
রুদ্র ব্রিগেড: যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্ত লজিস্টিক ও ক্ষমতা এক জায়গায় আনতে স্বতন্ত্র আর্মার্ড এবং মাউণ্টেন ব্রিগেডগুলিকে ধাপে ধাপে ‘রুদ্র ব্রিগেড’-এ রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
ভৈরব ব্যাটেলিয়ন: হাই-টেম্পো এবং হাইব্রিড যুদ্ধের মোকাবিলায় ১৫টি লাইট কমান্ডো ব্যাটালিয়ন গড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শক্তি-বাণ রেজিমেন্ট: মাঝারি আর্টিলারি রেজিমেন্টগুলিকে পুনর্গঠিত করে তিনটি নতুন ‘শক্তি-বাণ রেজিমেন্ট’ তৈরি করা হয়েছে।
দিব্যাস্ত্র ব্যাটারি: দেশের পাঁচটি মাঝারি রেজিমেন্টে বিশেষ ‘দিব্যাস্ত্র ব্যাটারি’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অশনি ড্রোন প্লাটুং: নজরদারি ও সার্ভাইল্যান্স ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে প্রতিটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে ধাপে ধাপে ড্রোন প্লাটুং যুক্ত করা হচ্ছে।
স্বনির্ভরতার পথে বিরাট মাইলফলক:
‘আত্মনির্ভর ভারত’ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ভারতীয় সেনা এখন দেশীয়করণের পথে হাঁটছে। গত তিন আর্থিক বছরে মোট ১২২টি ক্যাপিটাল কন্ট্রাক্টের মধ্যে ১২০টিই দেশীয় কোম্পানির সঙ্গে করা হয়েছে, যার মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ১.০০ লক্ষ কোটি টাকা। বিগত দশ বছরে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও ভারতীয় ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রায় ২.৩১ লক্ষ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এমনকি আগামী ১০ বছরের জন্য গোলাবারুদ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতার রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৯১ শতাংশ গোলাবারুদ দেশীয় উৎস থেকেই সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘নাগ এমকে-২’ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইলের সফল ফিল্ড ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে এবং ৮১৯টিরও বেশি ড্রোন ইতিমধ্যেই নিজস্ব ইন-হাউস ও এমএসএমই (MSME) সহযোগিতায় তৈরি করে ফেলেছে সেনা।
এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দুনিয়ায় সেনা:
যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স-এর ব্যবহার ব্যাপক মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে। ‘প্রজেক্ট কৌটিল্য’-এর মাধ্যমে ব্রিগেড স্তরের ডেটা নিখুঁতভাবে সাজিয়ে কমান্ডারদের জন্য এআই-ভিত্তিক অ্যালার্ট তৈরি করা হচ্ছে। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের ক্ষেত্রে ‘ECAS/EWAS’ এবং সফটওয়্যার সুরক্ষার জন্য ‘DevSecOps Lab’ স্থাপন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস এবং সংবেদনশীল এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা পেতে ‘প্রক্ষেপণ’ (PRAKSHEPAN) নামের একটি এআই-ভিত্তিক মিলিটারি ক্লাইমেটোলজি অ্যাপ্লিকেশনও চালু করেছে ভারতীয় সেনা। সবমিলিয়ে, ভবিষ্যতের যেকোনো কঠিন যুদ্ধের জন্য এক আধুনিক, প্রযুক্তি-সক্ষম এবং সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছে ভারত।