মায়াবতীর দুর্গে বড় ভাঙন ধরাতে চলেছেন অখিলেশ? উত্তরপ্রদেশ ভোটের আগে কোন মেগা ছকে এগোচ্ছে সপা?

উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই চূড়ান্ত রাজনৈতিক ছক কষতে শুরু করেছে সমাজবাদী পার্টি (সপা)। লোকসভা নির্বাচনে ‘পিডিএ’ (PDA) অর্থাৎ পিছিয়ে থাকা, দলিত ও সংখ্যালঘু সমীকরণের হাত ধরে যে অভাবনীয় সাফল্য মিলেছিল, এবার সেই একই সামাজিক সমীকরণকে বিধানসভা ভোট পর্যন্ত জোরালো করতে মরিয়া অখিলেশ যাদব। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য সপা এমন দুটি কৌশলগত এলাকাকে বেছে নিয়েছে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে বিজেপির চরম প্রভাব রয়েছে, অথচ জাতপাতের সমীকরণ খুবই নির্ণায়ক।
এর মধ্যে প্রথম কেন্দ্রটি হলো আগ্রা, যেখানে আগামী ১৫ নভেম্বর পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের একটি বিশাল দলিত সম্মেলন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর দ্বিতীয় কেন্দ্রটি হলো মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজনৈতিক গড় হিসেবে পরিচিত গোরক্ষপুর, যেখানে দীপাবলির সময় সপার জাতীয় অধিবেশন করার প্রস্তুতি চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগ্রায় মূলত বসপার দলিত ভোটব্যাঙ্কে বড় ধরনের থাবা বসানো এবং গোরক্ষপুরে বিজেপির দুর্গের অন্দরে নির্দিষ্ট সামাজিক সমীকরণের মাধ্যমে ফাটল ধরানোই অখিলেশের মূল রাজনৈতিক কৌশল।
আগ্রা থেকে দলিত রাজনীতির নতুন সমীকরণ?
আগ্রায় আয়োজিত এই দলিত সম্মেলন সপার কাছে কেবল একটি সাংগঠনিক কর্মসূচি নয়। এই পুরো অনুষ্ঠানের মূল কান্ডারি করা হয়েছে দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক রামজিলাল সুমনকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে আগ্রায় তফশিলি জাতির জনসংখ্যা প্রায় ২২.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ এখানকার প্রতি চার-পাঁচজন ভোটারের মধ্যে অন্তত একজন এসসি সম্প্রদায়ের এবং এই গোটা অঞ্চলে জাটভ সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই এই ভোটব্যাঙ্ক বহজন সমাজ পার্টির (বসপা) দুর্গ হিসেবে পরিচিত। শুধু তাই নয়, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের একাধিক জেলায় দলিত ভোটারদের একটি বড় অংশ রয়েছে, যা ভোটবাক্সে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০০৭ ও ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বসপা আগ্রার ছটি আসনেই জয়লাভ করেছিল। কিন্তু ২০১৭ ও ২০২২ সালে কংগ্রেস বা রাষ্ট্রীয় লোকদলের (RLD) সঙ্গে জোট বেঁধেও সপা এই অঞ্চলে খাতা খুলতে পারেনি। এমনকি ২০২২ সালের নির্বাচনেও বিজেপি আগ্রার সবকটি আসনেই জয়ী হয়। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ছবিটা বদলায়। আগ্রা সংরক্ষিত আসনে সপার প্রার্থী দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসেন এবং ফতেহপুর সিক্রি আসনেও কংগ্রেস প্রার্থী ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই সাফল্য থেকেই অখিলেশ আশাবাদী যে, বিধানসভা নির্বাচনেও পিডিএ ফর্মুলা কাজে লাগানো সম্ভব।
যোগীর গোরক্ষপুরে অন্য অঙ্ক:
অখিলেশ যাদবের এই মহা-পরিকল্পনার দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি হলো গোরক্ষপুর। দীপাবলির ঠিক আগে সেখানে দলের জাতীয় অধিবেশন ডাকার অর্থ হলো সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ঘরের মাঠে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছোঁড়া। গত বিধানসভা নির্বাচনে গোরক্ষপুর মণ্ডলের ২৮টি আসনের মধ্যে ২৭টিতেই জিতেছিল বিজেপি। ফলে সেখানে সপার লড়াই যে সহজ হবে না, তা স্পষ্ট।
গোরক্ষপুরে শুধু যাদব ও মুসলিম ভোটের ওপর ভরসা না করে বিজেপি-র মূল সামাজিক আধার—যেমন নিষাদ, কুর্মি এবং ব্রাহ্মণ ভোটারদের দিকেও নজর দিয়েছেন সপা সুপ্রিমো। স্থানীয় স্তরে নিষাদ সমাজের অসন্তোষকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি, প্রবীণ নেতা পন্ডিত হরিশঙ্কর তিওয়ারির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ব্রাহ্মণ কার্ডের মাধ্যমে পূর্বপ্রদেশের একাধিক মণ্ডলে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়াই অখিলেশের মূল উদ্দেশ্য। সব মিলিয়ে, ২০২৭-এর মহারণে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিকে পুরোপুরি নিজেদের অনুকূলে টানতে এখন থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমাজবাদী পার্টি।