ঘণ্টার আওয়াজে একসময় সময় মাপত পুরো শহর! আজ অযত্নে ধুঁকছে নবাবি আমলের ঐতিহাসিক ঘণ্টাঘর

ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ শহরের দক্ষিণ দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই ডানদিকে চোখে পড়ে বহু পুরনো এক ঘণ্টাঘর। একসময় এই ঘণ্টার সুমধুর ধ্বনিতেই সময় সম্পর্কে সচেতন হতেন শহরবাসী। কিন্তু মুর্শিদাবাদ এস্টেটের তত্ত্বাবধানে থাকা এই অমূল্য ঐতিহাসিক ঘণ্টাটি বর্তমানে দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। অতীতে কর্মচারীরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে দড়ি টেনে এই ঘণ্টা বাজাতেন, তবে সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা অবসর নেওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় ঘণ্টার সেই পরিচিত শব্দ।

ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম
কয়েক বছর আগে যৎসামান্য সংস্কার করা হলেও বর্তমানে চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে এই ঘণ্টাঘর। যার ফলে মুর্শিদাবাদে ঘুরতে আসা দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ঐতিহাসিক এই ঘণ্টাটির আওয়াজ শোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঘণ্টাটি দেখভালের সম্পূর্ণ দায়িত্ব মুর্শিদাবাদ এস্টেটের হাতে থাকলেও, এস্টেটের ম্যানেজার থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে থাকা এই স্মারক মেরামতের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, এটি কেবল একটি সাধারণ ঘণ্টা নয়, বরং মুর্শিদাবাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য স্মারক। তাই অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ঘণ্টাটিকে পুনরায় সচল করার জোরালো দাবি উঠেছে।

ঘণ্টাঘরের নেপথ্য ইতিহাস ও নবাবি আমলের স্মৃতি
উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৮১০ বা তার কাছাকাছি সময়ে নবাব আলিজার আমলে এই ঘণ্টাঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মূলত সৈন্যদের সতর্কীকরণ বার্তা পাঠানো এবং সঠিক সময় জানানোর উদ্দেশ্যেই এই ঘণ্টাঘরটি তৈরি করা হয়েছিল। নবাব পরিবার সূত্রে জানা যায়, বর্তমান দক্ষিণ দরজার সামনে যেখানে সিরাজউদ্দৌলা পার্ক অবস্থিত, একসময় ঠিক সেখানেই ছিল নবাব জাইন-উদ্দিন-আলি খান বা নবাব আলিজার প্রাসাদ।

সেই প্রাসাদ সহ সমগ্র কেল্লা চত্বরের প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল এই দক্ষিণ দরজা। দক্ষিণ দরজা সংলগ্ন ঘণ্টাঘরের পাশেই ঐতিহাসিক সৈন্য ক্যাম্প আজও বর্তমান, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে সেখানে সাধারণ মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে। সেই প্রাচীন সৈন্য ক্যাম্পের পাশেই কেল্লা চত্বরের প্রবেশদ্বারে তৈরি করা হয়েছিল এই ঘণ্টাঘর। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেনাসৈনিকদের সতর্ক করতে বা সময় জানানোর কাজে এই ঘণ্টা ব্যবহার করা হতো, যার আওয়াজ শুনে আশপাশের সাধারণ মানুষও সময় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতেন। এদিকে পুরো বিষয়টি ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের নজরে এসেছে বলে জানানো হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে এই সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *