আঙুল ফোটালে কি সত্যিই আর্থ্রাইটিস হয়? ছোটবেলার ভয়ের নেপথ্যে আসল সত্যিটা জানলে চমকে যাবেন!

বোরিং লাগছে বা একটু আরাম পেতে আমরা অনেকেই মটমট করে আঙুলের গাঁট ফাটাই। কারও কারও তো দিনে ২০-৩০ বার এই কাজ না করলে চলেও না। কিন্তু পাশ থেকে মা বা ঠাকুমা সঙ্গে সঙ্গে বারণ করে বলে ওঠেন, “বেশি আঙুল ফাটাস না, বুড়ো বয়সে আর্থ্রাইটিস হবে, আঙুল বেঁকে যাবে!” এই ভয়টা ছোটবেলা থেকেই আমাদের মনের কোণে গেঁথে আছে। কিন্তু আদতে কি আঙুল ফাটালে আর্থ্রাইটিস হয়? বিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
আঙুল ফাটালে আসলে ভেতরে কী হয়?
আমাদের প্রতিটি জয়েন্টের চারপাশে ‘সাইনোভিয়াল ফ্লুইড’ নামে এক ধরনের পিচ্ছিল তরল থাকে, যা জয়েন্টকে লুব্রিকেট করে এবং হাড়ে হাড়ে ঘষা লাগা থেকে বাঁচায়। এই তরলের মধ্যে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।
যখন আপনি আঙুল টেনে বা চেপে ফাটান, তখন জয়েন্টের ভেতরের জায়গা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং ভেতরের চাপ বা প্রেসার কমে যায়। ফলে ওই তরলের মধ্যে থাকা গ্যাস বুদবুদ আকারে বেরিয়ে আসে এবং ফেটে যায়। মট করে যে শব্দটা আমরা শুনি, তা আসলে এই বুদবুদ ফাটারই শব্দ—ঠিক যেমন পপকর্ন ফোটার প্রক্রিয়া। এতে কোনো হাড় ভাঙে না বা ক্ষয়েও যায় না। একবার ফাটানোর পর ওই গ্যাস আবার তরলে মিশতে প্রায় ১৫-২০ মিনিট সময় নেয়, তাই সঙ্গে সঙ্গে একই আঙুল দুবার ফাটানো সম্ভব হয় না।
তাহলে কি আর্থ্রাইটিস হয়? গবেষণা কী বলছে?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষকদের মতে, আঙুল ফাটানোর সঙ্গে আর্থ্রাইটিসের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এই নিয়ে অতীতে বহু দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা হয়েছে। সবচেয়ে বিখ্যাত গবেষণাটি করেছিলেন আমেরিকার ডাক্তার ডোনাল্ড উঙ্গার। তিনি টানা ৬০ বছর ধরে নিজের বাঁ হাতের আঙুল প্রতিদিন অন্তত দুবার করে ফাটিয়েছিলেন, কিন্তু ডান হাতের আঙুল একবারও ফাটাননি। ৬০ বছর পর দুই হাতের এক্স-রে করে দেখা যায়, দুই হাতেই বিন্দুমাত্র আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ নেই। মজার এই গবেষণার জন্য তিনি ২০০৯ সালে ব্যঙ্গাত্মক নোবেল পুরস্কার ‘ইগ নোবেল’ও পান।
পরবর্তীকালে ২০১১ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল প্রায় ২১৫ জনের ওপর গবেষণা চালায় এবং ২০১৭ সালের একটি বড় রিভিউ স্টাডিতেও প্রমাণিত হয় যে, আঙুল ফাটানোর সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের কোনো যোগসূত্র নেই। মূলত বয়স, জেনেটিক্স, অতিরিক্ত ওজন এবং অতীতে জয়েন্টে চোট লাগার কারণেই আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকে।
অভ্যাসটি কি সম্পূর্ণ নিরাপদ? কখন সাবধান হবেন?
আর্থ্রাইটিস না হলেও, অতিরিক্ত বা জোরে আঙুল ফাটানোর কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে:
লিগামেন্ট দুর্বল হওয়া: খুব জোরে বা ঘন ঘন আঙুল ফাটালে জয়েন্টের চারপাশের লিগামেন্ট ঢিলে হয়ে যেতে পারে, ফলে জয়েন্ট কিছুটা নড়বড়ে হয়ে যায়।
নরম টিস্যুতে চোট: অতিরিক্ত জোরে টানাচাটা করলে জয়েন্টের আশেপাশের নরম টিস্যু বা টেন্ডনে সাময়িক চোট লাগতে পারে এবং হাত ফুলে যেতে পারে।
হাতের গ্রিপ কমা: একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত জোরে আঙুল ফাটালে হাতের মুঠো ধরার ক্ষমতা বা গ্রিপ স্ট্রেন্থ কিছুটা কমে যেতে পারে।
মানসিক অভ্যাস: অনেকের ক্ষেত্রেই এটি নার্ভাস হ্যাবিট বা উদ্বেগের লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
এমনিতে মাঝে মাঝে আরাম পাওয়ার জন্য আঙুল ফাটালে বড় কোনো ক্ষতি হয় না। তবে আঙুল ফাটানোর সময় যদি তীব্র ব্যথা হয়, জয়েন্ট ফুলে ওঠে, লাল হয়ে যায়, আঙুল সোজা করতে অসুবিধা হয় বা শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আঙুল আটকে যায়—তবে এটি সাধারণ অভ্যাস নয়। সেক্ষেত্রে অবহেলা না করে অবিলম্বে একজন অর্থোপেডিক ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।