‘ম্যারেজ সিস্টেম কোলাপ্স হয়ে যাবে!’ সুপ্রিম কোর্টে বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে বিস্ফোরক কেন্দ্র, জানুন আসল যুক্তি!

ভারতে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আইনি ও সামাজিক দিক থেকে জটিল এক বিতর্ক—’ম্যারিটাল রেপ’ বা বৈবাহিক ধর্ষণ (Marital Rape)। স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর যৌন সম্পর্ককে আইনিভাবে অপরাধ বা ধর্ষণের আওতাভুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়ে বর্তমানে শীর্ষ আদালতে চলছে টানাপোড়েন। আর এই পুরো ইস্যুতেই কেন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।

বর্তমান আইন ও মামলার পটভূমি

ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ৬৩ নম্বর ধারায় ধর্ষণের সাধারণ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর ‘আপবাদ-২’ (Exception-2) অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণের অপরাধের বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আইনগতভাবে এই ক্ষেত্রে স্বামীরা সুরক্ষা পেয়ে থাকেন।

এই নির্দিষ্ট আইনি বিধানকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়। গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০26 তারিখে এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু করার নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত। আদালত মূলত খতিয়ে দেখছে যে, এই আইনি সুরক্ষা বা ছাড় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করা যায় কি না।

কেন বৈবাহিক ধর্ষণের বিরোধিতা করছে কেন্দ্র?

সুপ্রিম কোর্টে এই আপবাদমূলক ধারা তুলে দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছে কেন্দ্র সরকার। তবে সরকারের যুক্তি মোটেও এমন নয় যে, নারীর সম্মতির কোনো দাম নেই। কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল সাফ জানিয়েছেন, বিয়ের পরেও নারীর সম্মতির গুরুত্ব অপরিসীম এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্ক স্থাপন ভুল। তা সত্ত্বেও এই ধারা বদল নিয়ে সরকারের বিরোধিতার মূল কারণগুলো হলো:

  • সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর ওপর প্রভাব: সরকারের মতে, বিয়ে কেবল দুটি মানুষের চুক্তি নয়; এর সঙ্গে পরিবার, সন্তান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা জড়িয়ে রয়েছে। বৈবাহিক সম্পর্ককে সাধারণ অপরাধের মাপকাঠিতে মাপলে তা দেশের চিরায়ত পারিবারিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারে বা বড় ধরনের সামাজিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।

  • আইনের ভিন্ন বিকল্প রয়েছে: কেন্দ্রের দাবি, স্ত্রী নির্যাতনের ক্ষেত্রে সুরক্ষা দিতে ইতিমধ্যেই দেশে গার্হস্থ্য হিংসা আইন (Domestic Violence Act), নিষ্ঠুরতা দমন এবং নারীর সুরক্ষায় একাধিক কড়া আইন রয়েছে। ফলে বৈবাহিক সম্পর্ককে সরাসরি কঠোরতম অপরাধের (রেপ) ধারায় না এনে বিদ্যমান আইনের মাধ্যমেই বিচার সম্ভব।

  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংসদের: সরকারের প্রধান আইনি যুক্তি হলো, বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা বা না করা সম্পূর্ণভাবে নীতিগত বিষয় এবং এটি সংসদের কাজ। আদালত নয়, বরং এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল আইনসভারই রয়েছে।

দুই পক্ষের মতভেদ

অন্যদিকে, মামলাকারীদের দাবি—বিয়ের মতো পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অর্থ এই নয় যে একজন নারী নিজের শরীরের উপর থেকে সমস্ত অধিকার বা ব্যক্তিস্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন। যদি জোরপূর্বক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, তবে তাকে শুধু বৈবাহিক সম্পর্কের অজুহাতে ছাড় দেওয়া উচিত নয়। தேசிய পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NFHS-5)-র পরিসংখ্যানের কথা তুলেও অনেকে নারীদের সুরক্ষায় কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন।

সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন রায়ের দিকে এখন গোটা দেশের নজর। একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নারীর অধিকারের প্রশ্ন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর সুরাহা—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রেখে শীর্ষ আদালত কী রায় দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *