গাড়ি চালাচ্ছেন না, শুধু পিছনের সিটে বসে আছেন? অজান্তেই আপনি ‘প্যাসেঞ্জার প্যারেন্ট’ হয়ে উঠছেন না তো!

সন্তানের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস, তার সব শখ-আহ্লাদ পূরণ এবং রোজগার করা মানেই আদর্শ অভিভাবক হওয়া নয়। একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে স্পষ্ট হবে, আপনার সন্তান ঠিক কোন ক্লাসে পড়ে, তার রোল নম্বর কত কিংবা তার প্রিয় বন্ধুর নাম কী—এই সাধারণ খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আপনার জানা আছে কি না। যদি উত্তর ‘না’ হয় এবং বাড়ির সমস্ত প্যারেন্টিং বা লালন-পালনের দায়িত্ব আপনার সঙ্গী একা সামলান, তবে মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় আপনি একজন ‘প্যাসেঞ্জার প্যারেন্ট’। এর অর্থ হলো, আপনি সন্তানের জীবনের গাড়িটিতে উপস্থিত রয়েছেন ঠিকই, কিন্তু স্টিয়ারিং আপনার হাতে নেই; আপনি কেবল পিছনের সিটে বসে পুরো যাত্রা উপভোগ করছেন।
‘প্যাসেঞ্জার প্যারেন্টিং’ আসলে কী?
‘যাত্রী অভিভাবক’ বা প্যাসেঞ্জার প্যারেন্ট হলেন এমন একজন মা কিংবা বাবা, যিনি শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকেও মানসিকভাবে বা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকেন। সহজ ভাষায়, সন্তান লালন-পালনের গাড়িটির স্টিয়ারিং থাকে একজনের হাতে, আর অন্যজন পাশের সিটে বসে নীরব দর্শক হয়ে থাকেন। আমাদের সমাজে এই দৃশ্য খুবই পরিচিত। দেখা যায়, মা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সন্তানের খাবার, পড়াশোনা, হোমওয়ার্ক, অসুস্থতা ও স্কুলের সমস্ত বিষয় একা সামলাচ্ছেন, আর বাবা সারাদিন অফিস, মোবাইল ও নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। সন্তান কিছু চাইলেই সহজ উত্তর দেওয়া হয়, “মায়ের কাছে যাও”। আবার কিছু ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টোও হতে পারে। এই ব্যবস্থায় একজন চালক এবং অন্যজন যাত্রী হয়ে ওঠেন, যা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতর থেকে সংসারের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
শিশুর ওপর এর মারাত্মক প্রভাব ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
শিশু মনোবিদ এবং ফ্যামিলি থerapist-দের মতে, প্যাসেঞ্জার প্যারেন্টিংয়ের প্রভাব শিশুর ওপর সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং শিশুর সারা জীবনের ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর দাগ ফেলে দেয়:
নিরাপত্তাহীনতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব: যখন একটি শিশু বুঝতে পারে যে তার একজন অভিভাবক তার প্রতি উদাসীন, তখন তার অবচেতন মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে সে হয়তো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই বোধ থেকে তার মধ্যে কম আত্মবিশ্বাস, উদ্বেগ এবং সবসময় পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় কাজ করতে শুরু করে।
প্যারেন্টাল বার্নআউট বা অতিরিক্ত চাপ: যে অভিভাবক একা সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন, তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে তিনি আর ধৈর্য ধরে সন্তানকে সামলাতে পারেন না এবং সেই হতাশা ও রাগ গিয়ে পড়ে নিষ্পাপ শিশুটির ওপর।
ভুল শিক্ষা ও পক্ষপাতিত্ব: শিশুরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান হয়। তারা খুব দ্রুত বুঝতে পারে কার কাছে বায়না করলে কাজ হবে আর কাকে ভয় পেতে হবে। একজন অভিভাবককে সে ভয় পেতে শেখে এবং অন্যজনকে ম্যানিপুলেট করতে শেখে, যা তার নৈতিক বিকাশে বড় বাধা।
ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনে প্রভাব: ছোটবেলা থেকে যে সম্পর্ক সে দেখে বড় হয়, বড় হয়ে সেটিকেও স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। ফলে ভবিষ্যতে তার নিজের পারিবারিক জীবনেও সে চরম দায়িত্বহীন হয়ে উঠতে পারে।
আপনি কি একজন প্যাসেঞ্জার প্যারেন্ট? নিজেকে যাচাই করুন
নিজের অবস্থান বুঝতে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন: আপনি কি সন্তানের ক্লাস শিক্ষক বা প্রিয় বন্ধুর নাম জানেন? সন্তান অসুস্থ হলে কী ওষুধ খায় বা তার কোনো খাদ্যে অ্যালার্জি আছে কি না তা কি আপনার জানা আছে? শেষ কবে সন্তানের হোমওয়ার্কে সাহায্য করেছেন বা তার সঙ্গে খেলাধুলা করেছেন? কিংবা “এটা ওর মা দেখবে”—এই কথাটি কি আপনার মুখে লেগেই থাকে? বেশিরভাগ উত্তর হ্যাঁ হলে এখনই সতর্ক হওয়ার সময়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?
মনোবিদদের মতে, এর একমাত্র সমাধান হলো ড্রাইভারের সিট শেয়ার করা। সন্তান লালন-পালন একক দায়িত্ব নয়, এটি একটি টিমওয়ার্ক। প্রতিদিন অন্তত কুড়ি থেকে ত্রিশ মিনিট কোনো মোবাইল বা টিভি স্ক্রিন ছাড়াই শুধু সন্তানের সঙ্গে কাটান। সপ্তাহে অন্তত একদিন তার পড়াশোনা বা ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব নিজে নিন। সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানের সামনে কখনোই আপনার সঙ্গীর প্যারেন্টিং পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা বা তাঁকে ছোট করবেন না। মনে রাখবেন, দামি খেলনার চেয়ে আপনার সক্রিয় উপস্থিতিই সন্তানের সবচেয়ে বড় সম্পদ।