‘আমিষ খাবার নোংরা!’ বাগেশ্বর বাবার ধমকের পর বাংলার প্রাচীন রাজবাড়ি ও বিখ্যাত মন্দিরের কোন গোপন ভোগ রহস্য সামনে এল?

দুর্গাপুজোয় আর দেড়মাসও বাকি নেই। ঠিক তার আগেই বাংলার আমিষ খাদ্যাভ্যাস নিয়ে অত্যন্ত বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেছেন মধ্যপ্রদেশের ‘বাগেশ্বর বাবা’ তথা ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, প্যান্ডেলের পিছনে বা মঞ্চের নীচে যারা আমিষ খাবার খান, তাঁদের ‘পাষণ্ড’ বলা উচিত এবং এই ধরনের খাবার বন্ধ হওয়া উচিত। ভিন রাজ্যের এক ধর্মগুরুর এমন ফতোয়ার পরেই পশ্চিমবঙ্গজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে, যে বাঙালি যুগ যুগ ধরে নিয়ম মেনে পুজো করে আসছে, তাঁদের খাবারে নাক গলানোর অধিকার তাঁকে কে দিল?

ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তথ্য বলছে, বাংলার সনাতন সংস্কৃতিতে দেবদেবীর পুজোয় আমিষ ভোগের রেওয়াজ অত্যন্ত প্রাচীন এবং শতাব্দীপ্রাচীন। শোভাবাজার রাজবাড়ি থেকে শুরু করে কালীঘাট বা তারাপীঠ—বহু প্রাচীন স্থানেই মায়ের ভোগে আমিষ পদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

শোভাবাজার রাজবাড়ির ঐতিহাসিক রীতি

দীর্ঘ আড়াইশো বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রেখে শোভাবাজার রাজবাড়িতে মা দুর্গাকে শাকম্ভরী রূপে আরাধনার পাশাপাশি জোড়া মাগুর মাছ নিবেদন করা হয়। রাজবাড়ির সদস্য দেবরাজ মিত্রের মতে, নবমীর দিন নিয়ম মেনে জোড়া মাগুর মাছ বলি দেওয়া হয় এবং তা ঠাকুরদালানেও তোলা হয়। সঙ্কল্পকারীরা বাদে পরিবারের অন্য সদস্যরা ঐতিহ্য মেনেই আমিষ আহার গ্রহণ করেন।

কালীঘাট মন্দিরের শতবর্ষের পরম্পরা

৫১ সতীপীঠের অন্যতম কালীঘাটে প্রতিদিন আমিষ ভোগের সুদীর্ঘ আয়োজন থাকে। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর অষ্টমীতে মহাপ্রসাদ হিসেবে মাংস ভোগের বিশেষ রীতি রয়েছে, যা পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া শুধুমাত্র আদা, ঘি ও বিশেষ মশলায় তৈরি হয়। এছাড়া কালীঘাট মন্দিরের দৈনন্দিন ভোগে প্রায় ১৫ কেজি মাছ দেওয়া হয়। সেবাইত বিদ্যুৎ হালদার জানান, কাতলা, চিংড়ি, পার্শে, কই কিংবা বর্ষাকালে ইলিশের মতো আঁশযুক্ত মাছই মাকে নিয়ম মেনে নিবেদন করা হয়।

তারাপীঠ ও অন্যান্য সতীপীঠের ভোগ

তারাপীঠে দেবীর সারাবছরের নিত্যপুজোয় শোল পোড়ার বিশেষ আয়োজন থাকে। পাশাপাশি বিশেষ দিনে পাঁঠাবলির রেওয়াজও রয়েছে। অন্যদিকে, নলহাটির নলাটেশ্বরী মন্দিরে দেবীর ভোগে সাদা ভাতের সঙ্গে মাছ নিবেদন করা হয়। লাভপুরের ফুল্লরা দেবীর মন্দিরে মাছের ঝোল ও মাছ ভাজার মতো আমিষ পদ দেওয়ার পাশাপাশি বলিপ্রথাও চালু রয়েছে। এছাড়া তমলুকের ৫১ সতীপীঠের অন্যতম বর্গভীমা মন্দিরে তন্ত্রচূড়ামণি অনুসারে প্রতিদিন দুবেলা শোলমাছের টক ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। ভিন রাজ্যের সাধুরা যতই ফতোয়া দিন না কেন, বাংলার শাশ্বত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এই আমিষ ভোগের সম্পর্ক যে ওপ্রোতোভাবে জড়িত, এই প্রাচীন রীতিগুলি তারই প্রমাণ দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *