সন্তানের কোন ক্লাসে পড়ে জানেন না? অজান্তেই আপনি ‘প্যাসেঞ্জার প্যারেন্ট’ নন তো?

আপনি সন্তানের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন, তার জন্য রোজগার করেন এবং সব শখ-আহ্লাদও মেটান। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো, আপনার সন্তান কোন ক্লাসে পড়ে, তার রোল নম্বর কত বা তার প্রিয় বন্ধুর নাম কী— এই খুঁটিনাটি তথ্যগুলো কি আপনার জানা আছে? যদি উত্তর ‘না’ হয় এবং বাড়ির সমস্ত প্যারেন্টিংয়ের দায়িত্ব আপনার সঙ্গী একা সামলান, তবে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় আপনি একজন ‘প্যাসেঞ্জার প্যারেন্ট’। অর্থাৎ, সন্তানের জীবনের গাড়িতে আপনি আছেন ঠিকই, কিন্তু গাড়িটা চালাচ্ছেন না, পিছনের সিটে বসে শুধু যাত্রা উপভোগ করছেন।

আমাদের সমাজে এই চিত্রটি অত্যন্ত পরিচিত। সাধারণত দেখা যায়, মা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সন্তানের খাওয়া, পড়াশোনা, স্কুলের হোমওয়ার্ক এবং অসুখ-বিসুখ একা সামলাচ্ছেন, আর বাবা সারাদিন অফিস ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত। সন্তান কাঁদলেই সহজ উত্তর আসে, “যাও, মায়ের কাছে যাও।” আবার অনেক ক্ষেত্রে উল্টোটাও হয়। এর ফলে সংসারে একধরনের নীরব ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।

শিশুর ওপর এর মারাত্মক প্রভাব:

মনোবিদ এবং ফ্যামিলি থেরাপিস্টদের মতে, প্যাসেঞ্জার প্যারেন্টিংয়ের প্রভাব শিশুর ওপর সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে শিশুর মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হতে পারে। যখন একটি শিশু দেখে যে একজন অভিভাবক তার প্রতি উদাসীন, তখন তার মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে সে হয়তো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়।

পাশাপাশি, যে অভিভাবক একা সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন, তিনি মারাত্মক প্যারেন্টাল বার্নআউটের শিকার হন। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত ওই অভিভাবকের রাগ ও হতাশা অনেক সময় গিয়ে পড়ে শিশুটির ওপর। এছাড়া শিশুরা খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে শেখে কোন অভিভাবককে ম্যানিপুলেট করতে হবে, যা তাদের নৈতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবন সম্পর্কেও তাদের মনে ভুল ধারণার জন্ম নেয়।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

মনোবিদদের পরামর্শ, সন্তান লালন-পালন একক কোনো দায়িত্ব নয়, এটি একটি নিখাদ টিমওয়ার্ক। প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট কোনো মোবাইল বা টিভি ছাড়া সরাসরি সন্তানের সঙ্গে কাটান। সপ্তাহে অন্তত একদিন তার স্কুলের পড়া বা হোমওয়ার্কে সাহায্য করার দায়িত্ব নিন। সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানের সামনে কখনোই সঙ্গীর প্যারেন্টিং নিয়ে খুঁত ধরবেন না। মনে রাখবেন, দামি খেলনা বা জামাকাপড়ের চেয়ে আপনার সক্রিয় উপস্থিতিই সন্তানের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *