‘বিয়ে মানেই ভোডাফোনের কুকুরের মতো স্বামীর পিছু পিছু ঘোরা নয়!’ যুগান্তকারী রায় মাদ্রাজ হাইকোর্টের

টেলিকম সংস্থা ভোডাফোনের পুরনো বিজ্ঞাপনে একটি ‘পাগ’ প্রজাতির কুকুর তার মালিকের পিছু পিছু সব জায়গায় ঘুরে বেড়াত। বাস্তবে একজন স্ত্রীকেও স্বামীর পিছু পিছু সেভাবে চলতে হবে, এমনটা আশা করা যায় না। একটি দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য বিবাদের শুনানির সময়ে মাদ্রাজ হাইকোর্ট এই কড়া পর্যবেক্ষণ দিয়েছে বলে ‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক ব্যক্তির বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন পারিবারিক আদালত খারিজ করে দিয়েছিল। সেই আদেশ বাতিল করার সময়ই আদালত এই মন্তব্য করে। পারিবারিক আদালত আবেদনটি খারিজ করার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল যে, ওই ব্যক্তি স্ত্রীকে সঙ্গে না নিয়ে কাজের প্রয়োজনে তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গাই থেকে মুম্বইতে চলে গিয়েছিলেন। তবে সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট।
বিচারপতি জি আর স্বামীনাথন এবং বিচারপতি এম ডি সুমাথির ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, বিয়ের অর্থই এই নয় যে দম্পতিকে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে একসঙ্গে থাকতেই হবে, বিশেষ করে যখন পেশাগত কাজ, পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার কারণে একসঙ্গে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। চাকরির প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তনের সময় স্বামীকে সবসময় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে—এমনটা আশা করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ আদালত জানায়, কোনো স্বামী সৈনিক হলে সেনাবাহিনীর ব্যারাকের ভেতরে সপরিবারে বসবাস করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
আদালত আরও উল্লেখ করে, স্ত্রীর নিজেরও চাকরি বা অন্যান্য ব্যক্তিগত দায়িত্ব থাকতে পারে। সেই প্রেক্ষিতেই বেঞ্চ মন্তব্য করে, “ওই অবিস্মরণীয় ভোডাফোন বিজ্ঞাপনের ‘পাগ’ কুকুরটির মতো আচরণ করার প্রত্যাশা তাঁর কাছে করা যায় না।” বিচারকরা জানান, ট্রায়াল কোর্টের এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে হয়তো কট্টরপন্থীরা স্বাগত জানাবেন, তবে তাঁরা এতে সায় দিচ্ছেন না। কেবল চাকরির কারণে আলাদাভাবে বসবাস করাকে কোনোভাবেই গুরুতর দাম্পত্য অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে ওই দম্পতির বিয়ে হয়েছিল এবং তাঁদের চার সন্তান রয়েছে। আদালতে যখন মামলার শুনানির জন্য ওঠে, তখন স্বামীর বয়স ছিল ৬৭ বছর এবং দম্পতি ইতিমধ্যে ১৬ বছর ধরে আলাদা বসবাস করছিলেন। স্বামী তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ আনলেও, অভিযুক্ত পক্ষকে আইনি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করায় আদালত সেই অভিযোগ খারিজ করে দেয়।
বেঞ্চ আরও জানায়, পক্ষদ্বয়ের মধ্যকার সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা আর কোনোভাবেই জোড়া লাগানোর নয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র তিক্ততা রয়েছে এবং তাঁদের পুনরায় একত্রিত হওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে আদালত জানায়, দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ এবং অর্থবহ দাম্পত্য সম্পর্কের সম্পূর্ণ ভাঙন নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং তা বিবাহবিচ্ছেদের যৌক্তিক কারণ হতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিবাহবিচ্ছেদের নির্দেশ দিলেও, স্ত্রীকে খোরপোশ বাবদ ৭ লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।