গোপনে গোশালায় প্রদীপের আলোয় হয়েছিল নামকরণ! কেন শ্রীকৃষ্ণের নাম ‘কৃষ্ণ’ রেখেছিলেন গর্গ মুনি?

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি, ঘোর অমাবস্যার রাত। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি, আর মথুরার কারাগারের সমস্ত প্রহরী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সেই অন্ধকার কারাগারেই জন্ম নিলেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। বসুদেব নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সেই দিব্য শিশুকে মাথায় করে উত্তাল যমুনা পার করে কংসের নজর এড়িয়ে গোকুলে নন্দরাজের ঘরে রেখে এলেন মা যশোদার কোলে। গোকুলে তখন আনন্দের জোয়ার। কিন্তু কংসের ভয়ে নন্দরাজ ঠিক করলেন, ছেলের নামকরণ অনুষ্ঠান খুব গোপনে সারতে হবে।
গোশালায় গর্গ মুনির আগমন ও নামকরণ
আর এই গোপন অনুষ্ঠানের জন্য নন্দরাজ ডেকে পাঠালেন যাদব বংশের কুলগুরু মহর্ষি গর্গকে। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, অত্যন্ত জ্ঞানী ও ত্রিকালদর্শী মহর্ষি গর্গ গোকুলে এসে নন্দরাজের বাড়ির এক কোণে গোশালার মধ্যে লুকিয়ে টিমটিমে প্রদীপের আলোয় সম্পন্ন করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক নামকরণ।
তিনি প্রথমে রোহিণী পুত্রকে কোলে নিয়ে তাঁর নাম রাখেন ‘বলরাম’। গর্গ মুনি জানান, এই পুত্র অত্যন্ত বলশালী হবে এবং সকলকে আনন্দ দেবে। এরপর তিনি কোলে তুলে নেন যশোদা নন্দনকে— যাঁর শান্ত শ্যামবর্ণ মনোমুগ্ধকর হাসি সকলের মন কেড়ে নেয়।
গর্গ মুনির মুখে যুগান্তকারী সত্য
সেই গোপনীয় অনুষ্ঠানেই নন্দ মহারাজকে এক অলৌকিক সত্যের কথা জানান গর্গ মুনি। তিনি বলেন, “এই বালক সাধারণ কেউ নয়। এর আগে ইনিই যুগে যুগে বিভিন্ন বর্ণে অববর্ত্তীর্ণ হয়েছেন। সত্য যুগে এর গায়ের রং ছিল শ্বেত বা সাদা, ত্রেতা যুগে এটি রক্তবর্ণ বা লাল রূপে এসেছিল, আর দ্বাপর যুগে এর আগে এটি পীতবর্ণ বা হলুদ রূপ ধারণ করেছিল। আর এবার কলিযুগের সন্ধিক্ষণে এটি কৃষ্ণ বর্ণ বা শ্যামবর্ণ ধারণ করেছে। তাই শাস্ত্র অনুসারে এই বালকের নাম হবে— কৃষ্ণ।”
নামের গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ
পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘কৃষ্ণ’ নামটি কেবল একটি সাধারণ নাম নয়, এর পেছনের দর্শন অত্যন্ত গভীর। সংস্কৃতে ‘কৃষ’ ধাতুর অর্থ হল ‘আকর্ষণ করা’ এবং ‘ণ’ অক্ষরটির অর্থ ‘আনন্দ দেওয়া’। অর্থাৎ, যিনি সমগ্র সৃষ্টি এবং সমস্ত জীবকে নিজের দিকে আকর্ষণ করেন এবং সকলকে পরমানন্দ দান করেন, তিনিই কৃষ্ণ।
আবার অন্য একটি মতে, ‘কৃষি’ শব্দের অর্থ সত্তা এবং ‘ণ’ মানে পরম আনন্দ। যিনি মানুষের অস্তিত্ব ও সত্তার মধ্যে পরম আনন্দ রূপে বিরাজ করেন, তিনিই শ্রীকৃষ্ণ। তাই এই নাম কেবল একটি শব্দের বন্ধন নয়, এটি স্বয়ং পরম ব্রহ্মের রূপ ও স্বরূপের অনন্য পরিচয়।