“আমরা বুঝি সত্যিই আপন ভাই”-উত্তম কুমারকে নিয়ে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ

টলিউডের সোনালি যুগের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র— মহানায়ক উত্তম কুমার এবং বর্ষীয়ান অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের আবহে এক সাক্ষাৎকারে মহানায়কের সঙ্গে কাটানো বহু পুরনো ও অন্তরঙ্গ স্মৃতির রোমন্থন করেছেন বিশ্বজিৎ। পর্দায় তাঁদের রসায়ন যেমন দর্শককে মুগ্ধ করেছিল, পর্দার পিছনের ব্যক্তিগত সম্পর্কটাও ছিল ঠিক তেমনই গভীর ও পারিবারিক।

স্মৃতির পাতা উল্টে বিশ্বজিৎবাবু স্মরণ করেছেন সেই বিখ্যাত ছবির শুটিংয়ের দিনগুলি, যেখানে উত্তম কুমার গান গাইছেন, আর তিনি সঙ্গে তবলা বাজাচ্ছেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে সেই গান শুনছেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। ‘দুই ভাই’ ছবির সেই দৃশ্য এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন তাঁরা বুঝি সত্যিই আপন ভাই। বিশ্বজিৎ অবশ্য তাঁকে ‘উত্তমদা’ বলেই ডাকতেন। তরুণ কুমার অর্থাৎ ‘বুড়ো’-র বদলে তিনি যেন মহানায়কের ভাই হয়ে উঠেছিলেন। বিশ্বজিতের কেরিয়ারের প্রথম ছবি ‘মায়ামৃগ’ না হলেও, উত্তম কুমার যখন কেরিয়ারের মধ্যগগনে, তখন জুনিয়র অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়ে চরিত্রের রোল করতেও দ্বিধা করেননি তিনি।

ময়রা স্ট্রিটের জলসা ও গানের আসর

অভিনয়ের পাশাপাশি উত্তম কুমারের গানবাজনার প্রতি চরম অনুরাগের কথা তুলে ধরে বিশ্বজিৎ জানান, তিনি নিজেও প্লেব্যাক করতেন। মুম্বই থেকে কলকাতায় ফিরলেই উত্তমদার নির্দেশ থাকত— “বেণু, বিশু এসেছে, পার্টির ব্যবস্থা করো।” কলকাতার ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে প্রায়ই বসত সেই জমজমাট আসর। খাওয়াদাওয়া আর গানবাজনার সেই আড্ডায় উপস্থিত থাকতেন সেই সময়ের সঙ্গীতজগতের মহারথীরা। শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভারা সেই জলসাকে মুখরিত করে তুলতেন।

ঘরোয়া সেই আড্ডায় প্রায়ই উত্তমদা আবদার করতেন, “বিশু, ওই খ্যামটা স্টাইলের গানটা ধর তো।” গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘তোমার চোখের কাজলে আমার ভালোবাসার কথা লেখা থাকবে…’ গানটি বারবার গাইতে হতো তাঁকে। আর বিশ্বজিতের গানে হারমোনিয়াম বাজাতেন স্বয়ং মহানায়ক।

পারিবারিক সম্পর্ক ও শেষ দিনগুলির স্মৃতি

কর্মসূত্রে আলাপ হলেও ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে এক পরম আস্থায় পরিণত হয়েছিল। উত্তম কুমারের প্রথম মাইল্ড অ্যাটাকের পর যখনই তিনি মুম্বই আসতেন, বেশির ভাগ সময়েই বিশ্বজিতের বাড়িতে উঠতেন। নিজের ফ্যামিলি ফিজ়িশিয়ান দিয়ে নিয়মিত তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেন বিশ্বজিৎ। ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ছবির শুটিংয়ের দিনগুলিতেও সন্ধে হলেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে তাঁরা কখনোই একে অপরের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাতেন না। উত্তম কুমারের প্রয়াণের সেই ধাক্কা স্মরণ করে বিশ্বজিৎ বলেন, সেদিন মা বলেছিলেন, ” তোর বটগাছটা চলে গেল।” বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী অধ্যায়ের সেই নস্ট্যালজিয়া আজো অটুট দুই শিল্পীর অকৃত্রিম সম্পর্কে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *