সাপের মুখে মৃত্যুপুরী! ১২০০ পার সাপে কাটা, তবু ওঝার ভিড়ে নষ্ট হচ্ছে ‘গোল্ডেন টাইম’!

বর্ষার শুরুতেই জলমগ্ন পশ্চিম মেদিনীপুর। আর এই দুর্যোগের মধ্যেই জেলাজুড়ে ত্রাসের অপর নাম হয়ে উঠেছে সাপের উপদ্রব। ঘরবাড়ি জলমগ্ন হওয়ায় মানুষের সঙ্গেই এবার আশ্রয় নিচ্ছেন বিষধর সাপের দল। স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১২০০ মানুষকে সাপে কামড়েছে, যার মধ্যে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। যদিও গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা কম, তবুও হাসপাতালমুখী হওয়ার অনীহা আর ওঝা-বৈদ্যের প্রতি অন্ধবিশ্বাসেই মূলত ডেকে আনছে বড় বিপদ।
বন্যায় ভাসছে বিস্তীর্ণ এলাকা, ঘরে ঘরে বিষধরদের হানা
টানা বৃষ্টি ও প্লাবনের জেরে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল, চন্দ্রকোনা, দাসপুর, গড়বেতা, পিংলা, সবং, কেশিয়ারি ও নারায়ণগড়ের বিস্তীর্ণ অংশ এখন জলমগ্ন। কাঁচা-পাকা বাড়ি থেকে শুরু করে ধানখেত—সবকিছুই জলের তলায়। বাধ্য হয়ে মানুষ শুকনো জায়গায় আশ্রয় নিলেও নিরাপদ নয় তাদের আশ্রয়স্থলও। জলের হাত থেকে বাঁচতে বিষধর সাপগুলোও এখন মানুষজনের ঘরেই থাবা বসাচ্ছে। ফলে জেলা ও ডিভিশনাল হাসপাতালগুলোতে সাপে কামড়ানোর জখম নিয়ে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন অজস্র মানুষ।
ঝুঁকিপূর্ণ ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’ এবং ওঝার চক্কর
জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর এই সময়ে যেখানে প্রায় ২২০০ জনকে সাপে কামড়েছিল এবং ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১২০০ এবং মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। সংখ্যাটা গতবারের চেয়ে কম হলেও মৃত্যুর হার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিকরা।
জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক সৌম্য শংকর সড়ঙ্গি জানান, সাপে কামড়ানোর পরবর্তী ১০০ মিনিট হলো ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’। এই সময়ের মধ্যে রোগীকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। অথচ সচেতনতার অভাবে সিংহভাগ মানুষ এখনও ওঝা বা গুণিনের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। ফলে মহামূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালেও জীবন বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “সাপে কামড়ানোর একমাত্র এবং নিশ্চিত চিকিৎসা হলো এভিএস (AVS বা অ্যান্টিভেনম), যা সমস্ত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। ওঝার কাছে সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে হাসপাতালে আসুন।”
প্রাণ কাড়ল খোদ সর্পবন্ধুরই!
কুসংস্কার এবং অসাবধানতা যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি মেদিনীপুর সদরের ধেড়ুয়ার এক ঘটনায়। এলাকার পরিচিত ‘সর্পবন্ধু’ তপন কুমার সিংহ (৫৪) কুকুরমুড়ি এলাকায় একটি বিষধর সাপ উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্ধারের পর প্লাস্টিকের পাত্রে ভরার সময় সাপটি তাঁকে ছোবল মারে।
অভিজ্ঞ সর্পবন্ধু হওয়া সত্ত্বেও তপনাবু বাবু সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে না গিয়ে সাপটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। এর ফলে তাঁর জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যায় অমূল্য ১০০ মিনিট। প্রায় তিন ঘণ্টা পর যখন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তত অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। চিকিৎসকরা এভিএস ইঞ্জেকশন দিলেও শেষরক্ষা হয়নি; প্রাণ হারাতে হয় তাঁকে। মৃত্যুর আগে তিনি নিজে সবাইকে সাপ নিয়ে সতর্ক করলেও, শেষ পর্যন্ত সচেতনতার অভাবই তাঁর প্রাণ কেড়ে নিল।
আজও বহু মানুষ আধুনিক চিকিৎসা ছেড়ে অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভরসা রাখছেন। কবে পুরোপুরি কাটবে এই ঘোর? স্বাস্থ্য দপ্তরের এই বার্তার পর সাধারণ মানুষের হুঁশ কবে ফেরে, এখন সেটাই দেখার।