নামী রেস্তোরাঁগুলিতে পচা মাংস, যৌথ অভিযানে অ্যাকশন মোডে ফুড সেফটি অফিসাররা

রেস্তোরাঁয় বসে পছন্দের খাবার খাচ্ছেন, অথচ চোখের আড়ালে রান্নাঘরে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে আরশোলা! কিংবা প্লেটে যে চিকেন আসছে, তাতে ইতিমধ্যেই ধরে গিয়েছে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক! ফুড সেফটি অফিসারদের একের পর এক আকস্মিক রেডার এবং সেখান থেকে উঠে আসা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পচা মাংসের ছবি ফের উসকে দিয়েছে ৮ বছর আগের সেই ত্রাস সৃষ্টিকারী ‘ভাগাড় কাণ্ড’-এর স্মৃতি। খাদ্য দফতর, পুরসভা এবং এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের এই মেগা যৌথ অভিযান ঘিরে এখন শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্যের হোটেল ও রেস্তোরাঁ মহলে।
ফিরে দেখা সেই ভাগাড় কাণ্ড
সময়টা ছিল ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস। সেই সময় এক তদন্তে উঠে এসেছিল অত্যন্ত গা ঘিনঘিনে এবং লোমহর্ষক কিছু তথ্য। জানা গিয়েছিল, মৃত পশুর মাংস কেটে রাখা হতো কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন হিমঘরে। পচা সেই মাংস দীর্ঘক্ষণ ভালো রাখতে ব্যবহার করা হতো অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, লেড সালফেট এবং ফরম্যালিনের মতো মারাত্মক সব রাসায়নিক। এরপর ভাগাড়ের সেই মাংস বাক্সে ভরে তার ওপর তাজা ইলিশ বা চিংড়ি মাছ সাজিয়ে পাচার করা হতো একাধিক প্রতিবেশী রাজ্যে। শহরের নামী-দামি রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শপিং মলের ফ্রোজেন কাউন্টারেও সরবরাহ করা হতো সেই মাংস। প্রায় ১০ বছর ধরে অবাধে চলেছিল এই রমরমা কারবার। সেবার ভাগাড় থেকে পচা মাংস উদ্ধারের ঘটনায় গোটা পশ্চিমবঙ্গে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।
বাদুড়িয়া থেকে মধ্যমগ্রাম: কোথায় কী ধরা পড়ল?
ভাগাড় কাণ্ডের প্রথম রেশ পাওয়া গিয়েছিল যে বাদুড়িয়া থেকে, এবার সেখানেই ফের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল। মঙ্গলবার বাদুড়িয়ার দিদিমণি রোডের একটি নামী রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে হানা দিয়ে ৪০ কেজি পচা মাংস উদ্ধার করেন খাদ্য দফতরের আধিকারিকরা। ওই মাংসে মুরগি এবং খাসির মাংস একসঙ্গে মেশানো ছিল। কর্মচারীরা সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করলেও আধিকারিকরা সন্তুষ্ট হননি। সঙ্গে সঙ্গে ওই রেস্তোরাঁকে কড়া নোটিশ ধরানো হয় এবং সদুত্তর না মিললে পাকাপাকিভাবে তা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, মধ্যমগ্রামের স্টার মলের একটি নামী রেস্তোরাঁয় ফুড সেফটি অভিযানে যা দেখা গেছে, তা সাধারণ মানুষের পিলে চমকে দেওয়ার মতো। সেখানকার ফ্রিজে মিলল ফাঙ্গাস বা ছত্রাক পড়া চিকেন! বাসি ও পচা মাংস দিয়েই খাবার তৈরি করা হচ্ছিল এবং আলুতে মেশানো হচ্ছিল ক্ষতিকর রং। এই অনিয়মের জেরে ইতিমধ্যেই ওই নামী রেস্তোরাঁর লাইসেন্স বাতিল করেছে খাদ্য দফতর। ফুড সেফটি দফতরের কর্তা প্রসেনজিৎ বটব্যালের নেতৃত্বে চলা ওই অভিযানে শুধু একটি রেস্তোরাঁ নয়, স্টার মলের ফুড কোর্টের একাধিক হোটেলের রান্নাঘরেই ব্যাপক অনিয়ম ও অপরিচ্ছন্নতার ছবি ধরা পড়েছে। অথচ ছুটির দিনগুলিতে এই মলে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান।
শক্তিগড় থেকে রাজ্যজুড়ে তল্লাশি
পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু কলকাতা বা তার আশপাশেই নয়, পূর্ব বর্ধমানের বিখ্যাত শক্তিগড়ের ল্যাংচা হাব সহ একাধিক জেলার হোটেল, ধাবা ও মিষ্টির দোকানেও কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের রেস্তোরাঁগুলিতেও অপরিচ্ছন্ন কিচেনের অভিযোগ মিলেছে। খাবার তৈরি, সংরক্ষণ এবং পরিবেশনের ক্ষেত্রে শহরের বহু জনপ্রিয় রেস্তোরাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আধিকারিকরা।
সম্প্রতি মুম্বইয়ে রেস্তোরাঁর কিচেনে ভেজাল পনির ও আরশোলা ঘুরে বেড়ানোর মতো ঘটনায় একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছেন ফুড সেফটি কমিশনার তুকারাম মুণ্ডে। মাত্র তিন মাসের মধ্যে তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এবার বাংলার ফুড সেফটি আধিকারিকদের এই অভিযানেও কি নড়েচড়ে বসবে হোটেল মালিকরা? নাকি নামী রেস্তোরাঁয় হাজার হাজার টাকা খরচ করে বিষই খাচ্ছেন আমজনতা— এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সকলের মনে।