করোনা রিপোর্ট ও অভিভাবকের অনুমতির অপেক্ষা! চিকিৎসার গাফিলতিতে যুবকের মৃত্যুর পর ১ কোটি জরিমানা হাসপাতালের

মস্তিষ্কে মারাত্মক স্ট্রোক। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তখন বাকি মাত্র কয়েকটা precious মুহূর্ত। অথচ সেই সঙ্কটজনক মুহূর্তেও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার বদলে হাসপাতালের টেবিলে চলল লম্বা অপেক্ষা—কখন আসবেন বাবা-মা, আর কখন হাতে মিলবে কোভিড পরীক্ষার রিপোর্ট! প্রক্রিয়াগত এই ভয়াবহ গাফিলতির জেরে প্রাণ হারাতে হয়েছিল এক তরুণ গবেষককে। ঘটনার দীর্ঘ ছ’বছর পর সেই মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়ে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে যৌথভাবে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিল হায়দরাবাদ জেলা উপভোক্তা কমিশন।

কী ঘটেছিল ৬ বছর আগে? ২০২০ সালের ১৭ অগস্ট হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের পিএইচডি গবেষক সূর্য প্রতাপকে হস্টেলের করিডরে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়ে তাঁকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় গাচিবৌলির সিটিজেন্স স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে এবং রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ‘মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি’ করা জরুরি ছিল।

কিন্তু অভিযোগ ওঠে, রোগীর বাবা-মা হাসপাতালে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের সম্মতির জন্য অপেক্ষা করা হয়। যদিও সহপাঠীরা চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করতে প্রস্তুত ছিলেন, তবুও হাসপাতালের তরফে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটানো হয়। পাশাপাশি, সেই সময়ে করোনা মহামারীর আবহ থাকায় কোভিড টেস্টের রিপোর্ট আসার জন্য তাঁকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে আটকে রাখা হয়। অথচ জরুরি পরিস্থিতিতে কোভিড রিপোর্টের জন্য জীবনদায়ী চিকিৎসা আটকে রাখা যাবে না—এমন স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও তা মানা হয়নি।

অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে শেষ পর্যন্ত ভেন্টিলেটরে এবং পরে অন্য একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। গত ২১ অগস্ট মাত্র ৩০ বছর বয়সে ব্রেন-ডেড হয়ে মৃত্যু হয় সূর্যর।

উপভোক্তা কমিশনের কঠোর বার্তা: ছেলের মৃত্যুর পর ন্যায়বিচারের দাবিতে উপভোক্তা কমিশনের দ্বারস্থ হন মৃত গবেষকের বাবা-মা। দীর্ঘ শুনানি ও সমস্ত চিকিৎসাসংক্রান্ত রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর কমিশন সিটিজেন্স স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল এবং নিউরোলজিস্ট ডা. অপর্ণা বিজয়কুমারকে চিকিৎসার গাফিলতির জন্য স্পষ্টভাবে দায়ী করে। রায়ে বলা হয়েছে, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে মৃতের পরিবারকে যৌথভাবে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এবং মামলার খরচ বাবদ আরও ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে বার্ষিক ৯ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। তবে অপর দুই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান—কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল এবং মেডসিস ল্যাবসের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তাঁদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এই রায় চিকিৎসা জগতে এক বড় বার্তা দিল—জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক নিয়ম বা প্রটোকলের বেড়াজাল নয়, রোগীর জীবন বাঁচানোই যে সবসময় সর্বাগ্রে হওয়া উচিত, তা আরও একবার প্রমাণ করল এই আইনি লড়াই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *