“৫০০ বছর ধরে যে গ্রামে ঢোকে না এক টুকরো মাংসও!”-কাঞ্চনগড়িয়ায় ‘বেঁচে’ চৈতন্যের স্মৃতি

মাথায় ঘোমটা, কোলে শিশু আর কাঁধে চালের বস্তা কিংবা উনুন নিয়ে মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছেন গ্রামের মহিলারা। কারও মুখে ক্লান্তি নেই, বরং সবার মুখেই চওড়া হাসি। কারণ একটাই—আজ তাঁরা গ্রামের বাইরে গিয়ে চটিয়ে মাংস রান্না করে খাবেন। কিন্তু ইচ্ছা করলেই ঘরের ভেতর উনুন চড়িয়ে এই পদ রান্নার জো নেই। কারণ বাংলার এমন এক গ্রাম রয়েছে, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কড়া নিয়মে নিষিদ্ধ করা হয়েছে মাংস প্রবেশ।

মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের সিজগ্রাম পঞ্চায়েতের কাঞ্চনগড়িয়া গ্রামে পা রাখলেই অন্যরকম এক আবহ অনুভব করা যায়। গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে শতবর্ষী এক রাধাগোবিন্দ মন্দির এবং তার পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল হরিতকি গাছ। স্থানীয়দের দৃঢ় বিশ্বাস, ৯১৬ বঙ্গাব্দে ওডিশা যাওয়ার পথে এই গ্রামে এসেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। মন্দিরে বিশ্রাম নিয়ে তিনি নিরামিষ আহার করেছিলেন এবং যাওয়ার সময় দ্বিজহরি দাসকে একটি হরিতকির বীজ দান করেছিলেন। মন্দিরের ঈশান কোণে সেই বীজ রোপণের পর থেকেই নাকি এই গ্রামে মাংস খাওয়া চিরতরে বন্ধ করে দেন গ্রামবাসীরা।

আধুনিক ইতিহাসের কষ্টিপাথরে এই দাবির জোরালো প্রমাণ না মিললেও, লোককথা ও বৈষ্ণব পরম্পরার ওপর ভর করেই বেঁচে রয়েছে এই বিশ্বাস। গ্রামের ১১০টি পরিবারের পৌনে চারশো মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশই নিরামিষাশী। তবে বাকিরা মাছ খেলেও মাংসে তাঁদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাড়িতে জামাই এলে বা আত্মীয়রা আসলেও মাংস রান্নার অনুমতি নেই ঘরের অন্দরে। সে ক্ষেত্রে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে গিয়ে রান্না করে, স্নান সেরে তবেই গ্রামে প্রবেশ করতে হয়।

প্রমাণের তোয়াক্কা না করে ভক্তি ও ঐতিহ্যকে আঁক ধরেই বেঁচে রয়েছে কাঞ্চনগড়িয়া। এই গ্রামের প্রতিটি ধুলিকণায় যেন জড়িয়ে রয়েছে মহাপ্রভুর পদধূলির ইতিহাস, যা আজও অবাক করে দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *