“নদীর পেটে রিসর্ট, ব্যালকনিতে কফির কাপ”—উন্নয়নের নামে উত্তরবঙ্গে ডেকে আনা হচ্ছে প্রলয়?

উন্নয়ন ও পর্যটনের রমরমা বাড়াতে গিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেওয়ার মাশুল কি এ বার হাড় হিম করা বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে উত্তরবঙ্গবাসীকে? নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে এই আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন পরিবেশপ্রেমী ও নদী বিশেষজ্ঞরা। পাহাড়ি নদীগুলির গতিপথ রুদ্ধ করে যেভাবে যত্রতত্র হোটেল, রিসর্ট এবং হোমস্টে গড়ে উঠেছে, তাতে যে কোনো মুহূর্তে বড়সড় প্রলয়ের আশঙ্কা দেখছেন তাঁরা।
শেষ দুই দশকে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলার পাহাড়ি নদীগুলির কোল ঘেঁষে কিংবা সরাসরি নদীর উপরেই গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য বাণিজ্যিক নির্মাণ। তিস্তা, বালাসন, রঙ্গিত, জলঢাকা, তোর্সা, মূর্তির মতো খরস্রোতা নদীগুলির পাড় বা জলমগ্ন অংশে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল কটেজ। কোথাও নদীর জলের ওপরেই ঝুলন্ত ডিনারের ব্যবস্থা, আবার কোথাও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নদী দেখার রোমাঞ্চ—পর্যটকদের কাছে দারুণ লোভনীয় হলেও আদতে এটি এক মরণফাঁদ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগ, প্রশাসনের নীরব ভূমিকার সুযোগ নিয়ে আইনকে বুড়ো আঙুল দিয়েই তৈরি হয়েছে এই সমস্ত অবৈধ পরিকাঠামো।
নদী বিশেষজ্ঞ দেবর্ষি ঘোষের মতে, পাহাড়ি নদীগুলি অত্যন্ত খরস্রোতা এবং হঠাত্ হড়পা বান আসার প্রবণতা এদের চরিত্রেই রয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও বন্যাপ্রবণ এলাকাকে অগ্রাহ্য করে এ ধরনের নির্মাণ কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। পরিবেশবিদ নফসর আলির স্পষ্ট কথা, নিয়ম অনুযায়ী নদী থেকে অন্তত ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো নির্মাণকাজ করা নিষিদ্ধ। অথচ সেই আইনকে থোড়াই কেয়ার করে রমরমিয়ে চলছে ব্যবসা।
আইনজীবী সুভাষ দত্ত আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দকে নষ্ট করে যা চলছে, তাতে শিক্ষা না নিলে নেপালের মতো ভয়াবহ পরিণতি থেকে উত্তরবঙ্গকেও বাঁচানো যাবে না। পর্যটন বিশেষজ্ঞ তন্নিষ্ঠা রক্ষিতও এই সমস্ত নির্মাণকে একশ শতাংশ অবৈধ ও পরিবেশ-বিরোধী বলে তোপ দেগেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, গত বছর অক্টোবর মাসেই এই প্রকৃতির রোষের কিছুটা ঝলক দেখা গিয়েছিল।
এদিকে গোটা বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন, পর্যটন দপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য জেলাশাসকদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। তবে প্রশাসনের ঘুম ভাঙার আগেই এই অবৈধ নির্মাণগুলি বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে আনে কি না, এখন সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।