গাড়িতে বসে থাকলেই ঝরে যায় ৫ কেজি ওজন! ফর্মুলা ওয়ান রেসের এই ভয়ঙ্কর সত্যটা জানেন কি?

ফর্মুলা ওয়ান (Formula 1) রেসিং বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুপার ফাস্ট কার, চোখ ধাঁধানো স্পিড আর গ্ল্যামারে ভরপুর এক দুনিয়া। কিন্তু এই চকচকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর ও রোমহর্ষক সত্যি। ককপিটের ভেতরে বসে ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে গাড়ি ছোটানো যে কোনো সাধারণ মানুষের জন্য কোনো নরকীয় অগ্নিপরীক্ষার চেয়ে কম নয়। মাত্র ৯০ থেকে ১২০ মিনিটের একটিমাত্র রেসে F1 ড্রাইভারদের শরীর থেকে প্রায় ২ থেকে ৪ কেজি, এবং সিঙ্গাপুর বা কতারের মতো চরম গরম ও আর্দ্র ট্র্যাকে ৫ কেজি পর্যন্ত ওজন কমে যায়! তবে এই ওজন কোনো মেদ বা পেশি ক্ষয়ের কারণে নয়, বরং প্রচণ্ড গরমে ঘাম ঝরার মাধ্যমে শরীর থেকে বিপুল পরিমাণ জল ও তরল বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ঘটে।

ককপিটের ভেতরে কেন এত ওজন কমে যায়?

ফর্মুলা ওয়ান গাড়িতে চালকের ঠিক পেছনেই থাকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ইঞ্জিন। এছাড়া কার্ভিং বা মোড় ঘোরার সময় ব্রেকিংয়ের ফলে বিপুল পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হয়। এর জেরে ককপিটের ভেতরের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি ছুঁয়ে ফেলে। এর ওপর আবার আগুনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ড্রাইভারদের একাধিক স্তরের ভারী ফায়ারপ্রুফ স্যুট, ইনরওয়্যার, গ্লাভস এবং হেলমেট পরে থাকতে হয়। এই বিশেষ পোশাক শরীরের ভেতরের তাপ বাইরে বের হতে দেয় না, ফলে ককপিটের ভেতরটা একটা ফুটন্ত ‘সাউনা’ বা বাষ্পাগারের মতো হয়ে ওঠে।

৪ থেকে ৬ জি-ফোর্স এবং ১৭০-এর ওপরে হার্ট রেট

গাড়ি যখন ঘণ্টায় ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার বেগে তীব্র মোড় নেয়, তখন ড্রাইভারের শরীরের ওপর ৪ থেকে ৬ জি-ফোর্স (Gravitational Force) বা অভিকর্ষের চাপ তৈরি হয়। এর অর্থ হলো, চালককে তাঁর নিজের শরীরের ও মাথার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় ৪ থেকে ৬ গুণ বেশি ভারী বলে মনে হয়। এই প্রচণ্ড চাপ সামলাতে গিয়ে ড্রাইভারদের ঘাড়, শরীরের কোর অংশ এবং বাহুর পেশির ওপর অবিশ্বাস্য চাপ পড়ে। এই রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে একজন ড্রাইভারের শরীর প্রায় ১৫০০-র বেশি ক্যালোরি খরচ করে ফেলে, আর তাঁর হৃদস্পন্দন একটানা প্রতি মিনিটে ১৭০ বিটের ওপরে বজায় থাকে, যা কোনো ম্যারাথন দৌড়বিদের সঙ্গে তুলনীয়।

রেসের ঠিক পরেই কেন মাপা হয় ওজন?

সিঙ্গাপুরের মতো ট্র্যাকে যেখানে আর্দ্রতার মাত্রা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, সেখানে ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা ড্রাইভারের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই রেস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ড্রাইভারকে সরাসরি ওজন মাপার মেশিনে দাঁড় করানো হয়, যাতে বোঝা যায় শরীর থেকে কতটা জল বেরিয়ে গিয়েছে এবং তাঁকে ঠিক কী পরিমাণে ইলেকট্রোলাইটস ও চিকিৎসা সহায়তা দিতে হবে। যদিও রেস চলাকালীন হেলমেটের ভেতর থাকা বিশেষ নল দিয়ে ড্রাইভাররা জল বা তরল পান করেন, তবুও ঘামের অতি তীব্র গতির কাছে তা পর্যাপ্ত হয় না।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক অটোমোবাইল ফেডারেশন (FIA)-এর নিয়ম অনুযায়ী, ড্রাইভার এবং তাঁর সমস্ত সুরক্ষা সরঞ্জামের মোট ন্যূনতম ওজন অন্তত ৮০ কেজি হওয়া বাধ্যতামূলক। তার প্রযুক্তিগত সত্যতা যাচাইয়ের জন্যও এই ওজন মাপা অত্যন্ত জরুরি। একটু এদিক-ওদিক হলেই সামান্য ভুলেই ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *