‘মাটির নিচে চলে গেছে গ্রাম!’ চোখের পলকে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়েছিল চীনের যে অভিশপ্ত বাঁধ

“মনে হচ্ছিল আকাশ ভেঙে মাথার ওপর পড়ছে, আর পায়ের নিচের মাটি দুভাগ হয়ে যাচ্ছে”— ১৯৭৫ সালের ৮ আগস্ট মধ্যরাতের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে এভাবেই শিউরে উঠেছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী চেন বিন। সেদিন চোখের পলকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল চীনের তথাকথিত অপরাজেয় ‘লৌহ বাঁধ’ বা বাঙ্কিয়াও ড্যাম। মাও সেতুং-এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট চীনের গোড়ার দিকে প্রকৃতির ওপর মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে নির্মিত এই বাঁধটি এক লহমায় পরিণত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। মধ্যরাতে বাঁধ ভাঙার পর প্রায় দশ কিলোমিটার চওড়া এক দানবীয় জলপ্রাচীর তীব্র বেগে আছড়ে পড়েছিল হেনান প্রদেশের উপতাকা ও সমতলে, ঘুমন্ত অবস্থাতেই ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল একের পর এক গ্রাম ও জনপদ। সকাল হতে না হতেই বাঙ্কিয়াও ও শিমানতান সহ অন্তত ৬২টি বাঁধ একের পর এক ভেঙে পড়ে, যা মানব ইতিহাসের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাণঘাতী বন্যার রূপ নেয়।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই জলোচ্ছ্বাসে সরাসরি প্রাণ হারান প্রায় ২৬ হাজার মানুষ। তবে ট্র্যাজেডির শুরু সেখানেই ছিল না। প্রিন্সটন ও শিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের একটি যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে অনাহার ও মহামারীতে আরও প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯৫ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লিখিত চীনা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে মোট মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার। ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছিলেন প্রায় এক কোটি মানুষ, জলের নিচে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল শত শত গ্রাম, শহর, সড়ক ও রেলপথ।
সম্প্রতি তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন নেপালের ভোতে কোশী-ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা এবং চীনের অস্বচ্ছ পরিকাঠামো নির্মাণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ফের পাঁচ দশক আগের এই বাঙ্কিয়াও বিপর্যয়ের ক্ষতকে সামনে নিয়ে এসেছে। অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তের কাছে মেদগ কাউন্টিতে চীনের ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বিতর্কিত বাঁধ নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা যে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন, তার পেছনেও রয়েছে বাঙ্কিয়াও-এর মতো অতীতের চরম গাফিলতির ইতিহাস।
১৯৫১-৫২ সালে রু নদীর ওপর নির্মিত বাঙ্কিয়াও বাঁধে প্রথম থেকেই নানা ত্রুটি দেখা দিচ্ছিল। পরে সোভিয়েত প্রকৌশলীদের পরামর্শে তা মেরামত করে ‘লৌহ বাঁধ’ আখ্যা দেওয়া হলেও গোড়াতেই গলদ থেকে গিয়েছিল। তৎকালীন শীর্ষ জল বিশেষজ্ঞ চেন শিং সতর্ক করে বলেছিলেন, সমতলে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রেখে কেবল জল আটকে রাখার নীতি মারাত্মক প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি করবে। কিন্তু অন্ধ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সামনে সেদিনের সেই সৎ বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা গ্রাহ্য করা হয়নি, উল্টে চেন শিং-কে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের জুলাইয়ের শেষে প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট টাইফুন ‘নিনা’ স্থলভাগে আছড়ে পড়ার পর মধ্য চীনের বায়ুমণ্ডলে আটকে গিয়ে নজিরবিহীন মেঘভাঙা বৃষ্টি নামায়। লিনঝুয়াং এলাকায় মাত্র তিন দিনে রেকর্ড ১,০৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যার মধ্যে মাত্র ৬ ঘণ্টাতেই নেমেছিল ৮৩০ মিলিমিটার জল। বাঙ্কিয়াও জলাধারে প্রতি সেকেন্ডে ১৩ হাজার ঘনমিটার হারে জল ঢুকতে শুরু করলেও তার জলকপাটের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ১,৭০০ ঘনমিটার। এই চরম সংকটের মুহূর্তে সিদ্ধান্তহীনতা ও চরম প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করে। জল ছাড়ার স্পষ্ট সরকারি নির্দেশ না থাকায় এবং কোনও কর্মকর্তা একক দায়িত্বে ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় গেটগুলো যথাসময়ে পুরোপুরি খোলা হয়নি। ততক্ষণে টেলিফোন ও রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সামরিক বাহিনীর পাঠানো সংকেত স্থানীয় স্তরে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং বহু বার্তাবাহক নিজেই জলের তোড়ে ভেসে যান।
মাত্র কয়েকটি জনপদে সামান্য সময় আগে সতর্কবার্তা পৌঁছালেও অধিকাংশ মানুষ কোনও আঁচই পাননি। গভীর রাতে মাটির বাঁধ উপচে প্রায় ৭০ কোটি ঘনমিটার জল ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে নিচে নেমে আসে। পরবর্তী দিনগুলোতে বেইজিং-গুয়াংজু রেলপথ ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, দিনের পর দিন লাখ লাখ মানুষ গাছের ডালে বা উঁচু ভিটায় আশ্রয় নিয়ে আটকে থাকেন। পানীয় জলের তীব্র সংকট, প্রচণ্ড গরম এবং পচে যাওয়া মৃতদেহের দুর্গন্ধে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এনসেফালাইটিস ও নানা মহামারী। খাদ্যের অভাবে গাছের পাতা আর পোকা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিলেন অসংখ্য মানুষ।
কিন্তু তৎকালীন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আবহে চলা কমিউনিস্ট চীন সরকার এই নজিরবিহীন মানবসৃষ্ট দুর্যোগকে পুরোপুরি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। সংবাদমাধ্যমে কেবল ত্রাণকাজের মিথ্যা সাফল্য প্রচার করা হয়েছিল, কোথাও বাঁধ ভাঙার কিংবা মানুষের মৃত্যুর কোনও খবর প্রকাশ করা হয়নি। দীর্ঘদিন পর নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনার বিশদ তথ্য প্রকাশ্যে আসে। বাঙ্কিয়াও-এর ইতিহাস আমাদের আজও এক জ্বলন্ত শিক্ষা দিয়ে যায়— চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ তখনই গণহত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়, যখন তার সাথে যুক্ত হয় ভুল পরিকল্পনা, প্রশাসনিক অযোগ্যতা এবং তথ্যের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা।