চিনির পর এবার ডিমের বাজারে আগুন! সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়তে চলেছে কেন?

চিনির দাম বাড়ানোর পর এবার ইথানল উৎপাদন সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য—ডিমের দামের ওপর। পোল্ট্রি ফিড বা মুরগির খাদ্যের প্রধান উপাদান ভুট্টা এখন ইথানল তৈরিতে বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে বাজারে পশুখাদ্যের চরম সংকট তৈরি হয়েছে এবং তার জেরে লাফিয়ে বাড়ছে ডিমের দাম।

জাতীয় ডিম সমন্বয় কমিটির (এনইসিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ডিমের দাম প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বর্তমানে খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম প্রায় ৭ টাকা পড়ছে, যা বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে ৮.৫০ থেকে ৯ টাকার মধ্যে। পোল্ট্রি শিল্পের আধিকারিকদের আশঙ্কা, শীতকাল এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যখন ডিমের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে, তখন দাম আরও বাড়তে পারে।

এনইসিসি-র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের মোট ভুট্টা উৎপাদনের প্রায় ৩৭ শতাংশ এখন চলে যাচ্ছে ইথানল ডিস্টিলারিগুলোতে। সরকারের নতুন ইথানল মিশ্রণ বিধি অনুযায়ী, তেল কোম্পানিগুলোকে পেট্রোলের সঙ্গে জৈব জ্বালানি মেশাতে হয়। পেট্রোলে ইথানলের মিশ্রণ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় আখ ও ভুট্টার ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চিনি উৎপাদন এবং পশুখাদ্যের সরবরাহের ওপর।

ভুট্টার দামে রেকর্ড বৃদ্ধি
পোল্ট্রি শিল্পের প্রধান খরচই হলো ভুট্টা, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ দখল করে আছে। এই ঘাটতির কারণে তিন বছর আগে যে ভুট্টার দাম প্রতি টনে ছিল প্রায় ১৪,০০০ টাকা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬,৫০০ টাকায়। এমনকি গত পাঁচ মাসেই ভুট্টার দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংসদীয় তথ্য বলছে, ভারতে মোট ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ৪৩.৪ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে প্রায় ১৭ মিলিয়ন টনই এখন চলে যাচ্ছে ইথানল উৎপাদনে। ২০২২ সালে ভুট্টা থেকে ইথানল উৎপাদন মাত্র ১ মিলিয়ন টন থাকলেও, ২০২৪ সালে তা ৬ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে বর্তমানে প্রায় ১৭ মিলিয়নে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এই চাহিদা ২৫ মিলিয়ন টনে গিয়ে ঠেকবে।

রপ্তানিকারক থেকে আমদানিকারক দেশ ভারত
একসময় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিবেশী বাজারে নিয়মিত ভুট্টা রপ্তানি করত ভারত। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা আকাশচোঁয়া হওয়ায় এবং ইথানল তৈরিতে শস্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এখন আর পর্যাপ্ত পরিমাণ ভুট্টা উদ্বৃত্ত থাকছে না। উল্টে ভারত এখন বিদেশ থেকে ভুট্টা আমদানিতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২৫ অর্থবর্ষে ভারতের ভুট্টা আমদানি রেকর্ড ১০ লক্ষ টনে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশটি মিয়ানমার ও ইউক্রেন থেকে নিয়মিতভাবে শস্য সংগ্রহ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি না পেলে আগামী দিনে পোল্ট্রি শিল্প এবং সাধারণ মানুষের হেঁসেলে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *