স্যামসাংকে পিষে দিয়েছিল যে দেশি কোম্পানি, আজ কোথায় হারাল মাইক্রোম্যাক্স?

একটা সময় এমন ছিল, যখন নতুন ফোন কেনা মানেই অ্যাপেল বা স্যামসাংয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা ছিল না। ভারতীয় বাজারে এমন একটি দেশি নাম দাপিয়ে বেড়াত, যা জলের দরে দুর্দান্ত সব ফিচার দিয়ে সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল। পাড়ার দোকান থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের হাত—সব জায়গায় শুধু মাইক্রোম্যাক্সের (Micromax) জয়জয়কার দেখা যেত। একসময় স্যামসাংকে পর্যন্ত পেছনে ফেলে ভারতীয় স্মার্টফোনের বাজারে এক নম্বর সিংহাসন দখল করেছিল এই সংস্থা। হলিউড সুপারস্টার হিউ জ্যাকম্যানকে পর্যন্ত ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করেছিল তারা। কিন্তু আজ স্মার্টফোনের দুনিয়ায় মাইক্রোম্যাক্সের নামটুকুও আর শোনা যায় না। ঠিক কোন ভুলের মাশুলে এত বড় একটা সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হয়ে গেল?
যেভাবে শুরু হয়েছিল মাইক্রোম্যাক্সের পথচলা
রাহুল শর্মা, রাজেশ আগরওয়াল, বিকাশ জৈন এবং সুমিত কুমার মিলে এই সংস্থার গোড়াপত্তন করেছিলেন। শুরুর দিকে কোম্পানিটি সরাসরি মোবাইল ফোন তৈরি করত না, বরং নকিয়া এবং এয়ারটেলের মতো জায়ান্টদের জন্য হার্ডওয়্যার তৈরি করত। এরপর ২০০৮ সালের আশপাশে মোবাইল বাজারে পা রাখে তারা।
বিহারের একটি গ্রামে গিয়ে সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাহুল শর্মার এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা সংস্থার ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। সেখানে এক ব্যক্তিকে তিনি দেখেন, যিনি ট্রাকের বড় ব্যাটারি দিয়ে টাকার বিনিময়ে মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। এই দৃশ্য থেকেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারিযুক্ত ফোনের আইডিয়া মাথায় আসে। এর পরেই বাজার কাঁপাতে এমন সব ফোন নিয়ে আসে মাইক্রোম্যাক্স, যেগুলোতে কম দামে দুর্দান্ত ব্যাটারি ব্যাকআপ এবং সে জামানার যুগান্তকারী ডুয়াল-সিম ফিচার পাওয়া যেত।
‘ক্যানভাস’ ম্যাজিক ও এক নম্বর পজিশন
মাইক্রোম্যাক্সের ‘ক্যানভাস’ সিরিজ ভারতীয় বাজারে এক বিপ্লব এনেছিল। এই ফোনের জনপ্রিয়তা এতটাই আকাশছোঁয়া ছিল যে ২০১৪ সালে তারা স্যামসাংকে হটিয়ে দেশের বাজারের শীর্ষে পৌঁছে যায়। সেই সময় কোম্পানির বাজারমূল্য বা ভ্যালুয়েশন পৌঁছে গিয়েছিল প্রায় ২১,০০০ কোটি টাকায়। বড় বড় ইভেন্ট আর হলিউড তারকা হিউ জ্যাকম্যানকে সামনে রেখে তখন তুঙ্গে তাদের মার্কেটিং।
যে ভুলের মাশুলে পতন শুরু হয়
কিন্তু সাফল্যের রথ বেশিদূর এগোয়নি। শাওমি, ভিভো, অপ্পো এবং ওয়ানপ্লাসের মতো চিনা ব্র্যান্ডগুলো যখন ভারতীয় বাজারে ঝড় তুলল, তখন থেকেই মার খেতে শুরু করে মাইক্রোম্যাক্স। এই কোম্পানিগুলোর কাছে ছিল উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন এবং কম খরচে অত্যাধুনিক ফিচার দেওয়ার ক্ষমতা। অন্যদিকে, মাইক্রোম্যাক্স গবেষণা ও উন্নয়ন বা R&D-তে সেই মাত্রায় বিনিয়োগ করতে পারেনি। তৈরি করতে পারেনি বড় মাপের ম্যানুফ্যাকচারিং সিস্টেমও। পাশাপাশি, ফোনের সফটওয়্যার পারফরম্যান্স এবং বিক্রয়োত্তর পরিষেবা বা আফটার সেলস সার্ভিস নিয়ে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা দিন দিন খারাপ হতে শুরু করে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ফোরজি (4G) বিপ্লবের সময়। রিলায়েন্স জিও আসার পর ভারতে যখন ফোরজি ইন্টারনেটের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে, তখন মাইক্রোম্যাক্সের সিংহভাগ ফোনই ছিল টুজি এবং থ্রিজি নির্ভর। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই শাওমি ও ভিভো পুরো বাজার দখল করে নেয়। ফলস্বরূপ, ২০১৯ সালের শেষের দিকে মাইক্রোম্যাক্সের মার্কেট শেয়ার ও ভ্যালুয়েশনে মারাত্মক ধস নামে।
২০২০ সালে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ ও ‘ভোকাল ফর লোকাল’ স্লোগানকে সামনে রেখে ‘IN’ সিরিজের হাত ধরে কামব্যাকের চেষ্টা করেছিল মাইক্রোম্যাক্স। কিন্তু ততক্ষণে ক্রেতাদের পছন্দ ও প্রযুক্তির মান সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। শক্তিশালী সফটওয়্যার আর আধুনিক ফিচারের ভিড়ে হারিয়ে গেল একসময়ের গর্বের ভারতীয় ব্র্যান্ড।