ক্যানসারের সরকারি ওষুধে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া! দিল্লির কালোবাজার থেকে উদ্ধার ইনজেকশন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

রাজস্থানের বিকানেরের আচার্য তুলসী আঞ্চলিক ক্যান্সার চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ অতি মূল্যবান ক্যানসারের ইনজেকশন দিল্লির কালোবাজার থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত এক ভয়ঙ্কর মোড় নিয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা মার্ক কেজিএএ (Merck KGaA)-র একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংস্থার পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, উদ্ধার হওয়া ব্যাভেনসিও (অ্যাভেলুম্যাব) ইনজেকশনের নমুনাগুলো সম্পূর্ণ নকল এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াযুক্ত।

ঠিক কী ঘটেছিল?
গত ১৯ আগস্ট দিল্লি ক্রাইম ব্রাঞ্চের একটি দল মাদক ও নকল ওষুধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ২২টি অত্যন্ত দামি ক্যানসার ও ইমিউনোথেরাপি ইনজেকশন জব্দ করে। এর মধ্যে চারটি ব্যাভেনসিও ২০০ মিগ্রা/১০ মিলি ভায়াল রাজস্থান সরকারের কাছে পাঠানো সরকারি সরবরাহের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ভায়ালগুলোতে ‘AU052510’ ব্যাচ নম্বরটি ছিল। নথি অনুযায়ী, এই ব্যাচটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৈরি হয়েছিল এবং এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের জানুয়ারি মাসে।

উৎপাদনকারী সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এই ব্যাচটি রাজস্থান মেডিকেল সার্ভিসেস কর্পোরেশন লিমিটেড (RMSCL)-কে সরবরাহ করা হয়েছিল। এরপরই ঘটনার তদন্ত গিয়ে পৌঁছায় বিকানেরে।

মার্কের রিপোর্টে নকল ওষুধের আসল রূপ ও মারাত্মক ত্রুটি
গত ২৪ আগস্ট মার্কের প্রকাশিত বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে সন্দেহভাজন অ্যাভেলুম্যাব নমুনার প্যাকেজিং ও গুণমানে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে:

প্যাকেজিংয়ে কারসাজি: পরীক্ষার সময় ভায়ালের অ্যালুমিনিয়ামের ক্যাপ এবং রাবারের স্টপারে অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়। রাবারের স্টপারে প্রায় ১.২ মিমি × ০.১ মিমি মাপের একটি সূক্ষ্ম ছিদ্র এবং ক্যাপটিতে আঁচড়ের দাগ ছিল।

উপাদানে গরমিল: ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, আসল ওষুধের তুলনায় নমুনায় অ্যাভেলুম্যাবের ঘনত্ব অত্যন্ত কম। এমনকি নমুনায় আসল ওষুধের উপাদানের পরিমাণের সাথে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে।

সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় (ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি): জীবাণুমুক্ততা পরীক্ষায় নমুনাটি সম্পূর্ণ ফেল করে। নমুনায় এসচেরিচিয়া কোলাই (ই. কোলাই) এবং অন্য একটি নমুনায় সেরেশিয়া মার্সেসেন্স ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়েছে।

এই ফলাফলের ভিত্তিতে মার্ক উভয় নমুনাকেই ভুয়া বা নকল বলে ঘোষণা করেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, আসল ভায়ালগুলোর মূল তরল বের করে সেখানে কম মানের উপাদান বা ক্ষতিকর তরল পুনরায় ভরে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে।

নড়েচড়ে বসল প্রশাসন
এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের পর বিষয়টি আর কেবল সাধারণ কালোবাজারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বিপজ্জনক জালিয়াতি চক্রের দিকে ইঙ্গিত করছে। রাজস্থান সরকার ইতিমধ্যেই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। দিল্লি ক্রাইম ব্রাঞ্চ আরএমএসসিএল-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কাছে সমস্ত সরবরাহ ও মজুত সংক্রান্ত নথি তলব করেছে। পাশাপাশি পিবিএম হাসপাতাল প্রশাসনও একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

হাসপাতালের স্টক রেজিস্টার, প্রেরণের রেকর্ড এবং রোগীদের চিকিৎসার নথিপত্র খতিয়ে দেখে এই বিষাক্ত ও নকল ইনজেকশনগুলো ঠিক কোন পর্যায়ে হাসপাতালের সরবরাহ থেকে দিল্লির কালোবাজারে পৌঁছাল, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *