“ক্যানসারের ১ লক্ষ টাকার ইঞ্জেকশনে শুধু জল!”-দিল্লির কালোবাজারি চক্রের ভয়ঙ্কর কাণ্ডে থমকে গেল দেশ

ক্যানসারের একটি ইঞ্জেকশনের দাম ১ লক্ষ টাকা, অথচ তার ভিতরে রয়েছে স্রেফ জল! মারণ রোগের চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে এমন এক ভয়ঙ্কর কালোবাজারির চক্রের সন্ধান পেল দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। ক্যানসার রোগীরা দিল্লির কালোবাজারি থেকে যে ‘অ্যাভেলুম্যাব’ (Avelumab) ইঞ্জেকশন প্রায় এক লক্ষ টাকা খরচ করে কিনছিলেন, তার মধ্যে ক্যানসার প্রতিরোধের কোনো উপাদানই নেই—সবটাই শূন্য। ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার মাধ্যমে জার্মানির ল্যাবে সেই নমুনা পরীক্ষা করানোর পরেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। পুলিশের প্রাথমিক দাবি, রাজস্থানের সরকারি স্কিমে ক্যানসার রোগীদের জন্য বিনামূল্যে বা সরকারি ব্যবস্থায় সরবরাহ করা ওষুধও এই কালোবাজারি চক্রের মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছিল।

৯ কোটির চক্রের পর্দাফাঁস, গ্রেফতার ১৭:

গত ২০ অগাস্ট প্রায় সাতটি রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৯ কোটি টাকার এই বিশাল চক্রের পর্দাফাঁস করেছে ক্রাইম ব্রাঞ্চ। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের তরফে মোট ৫৮৮টি ভর্তি অ্যান্টি-ক্যানসার ভায়াল, ৬টি খালি ভায়াল, ৭টি খালি ওষুধের বাক্স, অন্যান্য দামি ওষুধের ৩,০২১ ইউনিট এবং নগদ প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এই সমস্ত জাল ও দামি ওষুধের তালিকায় রয়েছে ডারজালেক্স, ইমফিনজি, এরবিটাক্স, অপডাইটা, গাজিভা, বাভেনসিও, অ্যাডসেট্রিস এবং কিট্রুডার মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্যানসারের ওষুধ।

কীভাবে চলত এই কারবার?

পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছে, এই চক্রের নেটওয়ার্ক শুধু দিল্লি-এনসিআর নয়, বরং মুম্বই, হায়দরাবাদ, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিল। গত ২২ জুন গোপন সূত্রে খবর পাওয়ার পর এই বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়। এরপর পূর্ব দিল্লি, রোহিণী এবং মুম্বইয়ের বেশ কিছু সন্দেহজনক জায়গা চিহ্নিত করা হয়। গত ১১ জুলাই মাদক বিরোধী দফতর ও স্থানীয় পুলিশের যৌথ উদ্যোগে দিল্লি এবং নবি মুম্বইয়ে একসঙ্গে তল্লাশি চালানো হয়। টানা জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির পরেই এই ১৭ জনকে পাকড়াও করা হয়।

তদন্তকারীদের দাবি, মূলত তিনটি আলাদা পথে এই জাল চক্রের হাতে ওষুধ আসত। প্রথমত, বাজার থেকে নকল ওষুধ কেনা হত। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ক্যানসার রোগীদের জন্য মজুত রাখা ওষুধ কৌশলে সরিয়ে ফেলা হত। তৃতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুদাম থেকে ওষুধ বাইরে পাচার করা হত। এরপর এই সমস্ত ওষুধ কোনো রকম বৈধ বিল, কেনার রেকর্ড, ড্রাগ লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় নথি ছাড়াই বিভিন্ন বাড়ি ও গোপন গুদামে মজুত করা হতো। পরবর্তী সময়ে দালালদের মাধ্যমে তা নির্ধারিত জায়গায় সরবরাহ করা হত।

রিপ্যাকিং ও রি-লেবেলিংয়ের ভয়ংকর খেলা:

পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রটি আসল কার্টন এবং খালি ওষুধের বাক্সগুলি যত্ন করে জমিয়ে রাখত। এরপর অ্যাসিটোনের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করে আসল ব্যাচ নম্বর, এমআরপি এবং ওষুধের পরিচয় সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য মুছে ফেলা হতো। তারপর থার্মোকল বাক্স, বাবল র‍্যাপ, টেপ এবং পলিথিন ব্যবহার করে একদম নতুন ওষুধের মতো করে সেগুলির রি-প্যাকিং করা হতো।

পুরো কারবারের হিসাব রাখার জন্য ওষুধ ও নগদ লেনদেনের পৃথক রেজিস্টার ও ডায়েরিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীনগরের অভিষেক বৈশ্য, শুভম কুমার চৌধুরী এবং সূরজ চৌধুরী। পুলিশের দাবি, ২০২২ সাল থেকে এই অবৈধ ওষুধ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ছিল অভিষেক। তার কাছ থেকে ৪ লক্ষ টাকা এবং শুভমের কাছ থেকে ২৩ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

দেশজোড়া জাল ও তদন্তের মুখে বড় প্রশ্ন:

দিল্লি ছাড়াও নয়ডা, গুরুগ্রাম, গাজিয়াবাদ, ফরিদাবাদ, মুম্বই এবং হায়দরাবাদের বেশ কয়েকজন এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি বলে জানিয়েছে পুলিশ। নয়ডার আনন্দ কুমারের কাছ থেকে ৩৩৭টি অ্যান্টি-ক্যানসার ভায়াল, ফরিদাবাদের দীপক ওরফে রবির কাছ থেকে ১০৮টি ভায়াল এবং সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা এবং গুরুগ্রামের ময়ঙ্ক গর্গের কাছ থেকে ৫৫টি ভায়াল উদ্ধার করা হয়েছে। গত ১২ জুলাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ থানায় এই ঘটনায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। বর্তমানে পুলিশ ওষুধের জোগান এবং আর্থিক লেনদেনের গোটা নেটওয়ার্কটি খতিয়ে দেখছে।

তবে এই সমস্ত গ্রেফতারির মাঝেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে—ক্যানসারের মতো জীবনদায়ী ও মারণ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই নকল বা সরকারি গুদাম থেকে সরিয়ে নেওয়া ওষুধ গত কত দিন ধরে সরলসোজা রোগীদের কাছে পৌঁছেছিল? আর এই ভয়ঙ্কর চক্রের নেপথ্যে ঠিক কত বড় কোনো মাথা বা চক্র জড়িত রয়েছে, সেটাই এখন খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *