সংসারের কাজ আর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা না করলেই কি স্ত্রী অবাধ্য? কর্ণাটক হাইকোর্টের এই রায় বদলে দেবে আপনার ধারণাও!

বিয়ের পর স্ত্রীকে শুধুই সংসারের সমস্ত কাজ করা কিংবা স্বামীর বাবা-মায়ের দেখাশোনা করার দায়িত্বে বেঁধে ফেলা যায় না—একটি দাম্পত্য বিবাদ মামলার শুনানিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যবেক্ষণ জানাল কর্ণাটক হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, বিয়ে কোনোভাবেই কোনো মহিলার ব্যক্তিস্বাধীনতা, ইচ্ছা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করার লাইসেন্স হতে পারে না। সাম্প্রতিক এই রায় প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আইনি মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত এক স্বামীর দায়ের করা একটি রিভিশন পিটিশনকে কেন্দ্র করে। পারিবারিক আদালত এর আগে নির্দেশ দিয়েছিল যে ওই ব্যক্তিকে তাঁর স্ত্রী ও নাবালিকা মেয়ের ভরণপোষণ বাবদ প্রতি মাসে যথাক্রমে ৫ হাজার এবং ৪ হাজার টাকা—অর্থাৎ মোট ৯ হাজার টাকা করে দিতে হবে। আদালতের এই নির্দেশকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন স্বামী। তাঁর মূল অভিযোগ ছিল, স্ত্রী ঠিকমতো সংসারের কাজ করতেন না এবং তাঁর বাবা-মায়েরও যথাযথ দেখাশোনা করতেন না। এমনকি স্বামীর অনুমতি ছাড়াই স্ত্রী বারবার নিজের বাপের বাড়ি চলে যেতেন বলেও পিটিশনে দাবি করা হয়। অন্যদিকে, স্ত্রীর পাল্টা অভিযোগ ছিল যে স্বামী ও তাঁর পরিবারের লোকজনের হাতে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি, স্বামীর জুয়া ও মদ্যপানের আসক্তির কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি।
উভয় পক্ষের এই সমস্ত বক্তব্য শুনে কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচারপতি ড. চিল্লাকুর সুমলতার একক বেঞ্চ অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানায়, একজন স্ত্রীকে কেবল ঘরের কাজ করার জন্য নিযুক্ত কোনো কর্মীর মতো দেখা যায় না। ঠিক একইভাবে, স্বামীর বাবা-মায়ের দেখাশোনা করাও কোনো স্ত্রীর উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হতে পারে না। বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব তাঁদের নিজের সন্তান বা রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের। পুত্রবধূ বা জামাই সেই দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নেবেন কি না, তা সম্পূর্ণ তাঁদের নিজেদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
আদালত আরও প্রশ্ন তোলে যে, নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার মতো একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং মৌলিক ব্যক্তিগত ইচ্ছার জন্য একজন ভারতীয় মহিলাকে কেন শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অনুমতি নিতে হবে? বিচারপতি স্পষ্ট জানান, স্ত্রীর ঘরের বাইরে যাওয়া বা নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার কারও নেই। সংসারের কাজ এককভাবে কোনো মহিলার একচ্ছত্র দায়িত্ব নয়; বরং ঘরের সমস্ত কাজ নারী-পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া উচিত। স্বামীর ইচ্ছা ও অন্ধ প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে স্ত্রীকে বাধ্য করা আইনসিদ্ধ নয়।
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট পারিবারিক আদালতের দেওয়া মাসিক ৯ হাজার টাকা ভরণপোষণের নির্দেশে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করেনি। বর্তমান যুগের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার খরচ ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে এই আর্থিক পরিমাণ খুব বেশি নয় বলেই আদালত মন্তব্য করে এবং স্বামীর দায়ের করা আবেদনটি খারিজ করে দেয়।
প্রধান হাইলাইটস:
-
ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার: বিয়ে মানেই কোনো মহিলার ইচ্ছা, সিদ্ধান্ত বা মৌলিক স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার লাইসেন্স নয়।
-
ঘরের কাজের দায়িত্ব: সংসারের কাজ একার দায়িত্ব নয়, এটি নারী-পুরুষ উভয়েরই সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া উচিত।
-
শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা: বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব তাঁদের নিজস্ব সন্তানদের, কোনো পুত্রবধূকে জোর করে তা করতে বাধ্য করা যায় না।
-
বাপের বাড়ি যাওয়া: নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সাধারণ স্বাধীনতার জন্য শ্বশুরবাড়ির অনুমতির প্রয়োজন নেই।