যন্তর মন্তরের ঘটনার পর বড় সিদ্ধান্ত! গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বিরাট রদবদল আনল দিল্লি পুলিশ

গত ২০ জুলাই রাজধানী দিল্লির বুকে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন বিক্ষোভ এবং সহিংসতা থেকে চরম শিক্ষা নিয়েছে প্রশাসন। গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে এবার নিজেদের গোয়েন্দা পরিকাঠামো বা ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’-এর কার্যপ্রণালীতে আমূল রদবদল আনার সিদ্ধান্ত নিল দিল্লি পুলিশ। অতীতে শুধুমাত্র বিক্ষোভের স্থান এবং ভিড়ের একটি আনুমানিক হিসেব দিয়েই দায়িত্ব সারত গোয়েন্দা বিভাগ। কিন্তু এবার থেকে রাজধানীতে যে কোনও বড় জমায়েত বা বিক্ষোভের আগে অন্তত ১০টি নির্দিষ্ট ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত ২০ জুলাই শিক্ষাসংক্রান্ত একাধিক সংস্কারের দাবিতে প্রায় ৩০ হাজার তরুণ-তরুণী আচমকাই যন্তর মন্তর ও সংসদ ভবন অভিযানের উদ্দেশে রাস্তায় নেমে পড়েন। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের জমায়েত আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি পুলিশ। ভিড় সামলাতে গিয়ে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও ওঠে। এই গোটা ঘটনায় পুলিশের গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে চারদিকে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয় যে, গোটা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের জন্য সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ প্যানেল গঠন করেছে। শীর্ষ আদালতের এই পদক্ষেপের পরই নড়েচড়ে বসেছে দিল্লি পুলিশের শীর্ষ কর্তারা।

দিল্লি পুলিশের বর্তমান কমিশনার অনুরাগ কুমার গোয়েন্দা আধিকারিকদের অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, পুরনো ধাঁচে কাজ করলে আর চলবে না। এখন থেকে প্রতিটি আন্দোলনের একেবারে গভীরে গিয়ে তার মূল প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। নতুন এই ১০ দফা নির্দেশিকার মধ্যে পুলিশ মূলত যে বিষয়গুলির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে, তা হলো আন্দোলনকারীদের পরিচয় এবং উৎসবিন্দু। অর্থাৎ, কোন রাজ্য থেকে কতজন মানুষ দিল্লিতে আসছেন, তাঁরা কী ধরনের পরিবহণ ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন এবং ঠিক কার বা কোন সংগঠনের আহ্বানে তাঁরা সংগঠিত হচ্ছেন, তার নিখুঁত তথ্য আগে থেকে বের করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বের রূপরেখা ও ফিনান্সিং। আন্দোলনের নেপথ্যে কোন কোন সংগঠন সক্রিয় রয়েছে, তাদের আসল রাজনৈতিক বা সামাজিক লক্ষ্য কী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এই এত বড় কর্মসূচিতে কারা পিছন থেকে অর্থ জোগাচ্ছে বা ফান্ডিং করছে, গোয়েন্দাদের তা খুঁজে বের করতে হবে।

তৃতীয়ত, দিল্লির ডেরা এবং স্থানীয় যোগসূত্র। বাইরের রাজ্য থেকে আসা আন্দোলনকারীরা দিল্লিতে এসে কোথায় থাকছেন, শহরের কোন কোন জায়গায় তাঁদের যাতায়াত বেশি এবং স্থানীয় কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংগঠন তাঁদের লুকিয়ে সাহায্য করছে, সেই সমস্ত তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি, জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য আদান-প্রদান আরও দ্রুত ও নির্ভুল করার জন্য পুলিশের নিজস্ব ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে মোতায়েন থাকা সাধারণ পুলিশকর্মী এবং কন্ট্রোল রুমে থাকা ঊর্ধ্বতন অফিসারদের মধ্যে যাতে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় থাকে, তার জন্য সবরকম যান্ত্রিক ত্রুটি অবিলম্বে মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লালকেল্লা বা যন্তর মন্তরের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে যাতে আর কখনও এমন আচমকা জমায়েত করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো না যায়, তা নিশ্চিত করতেই দিল্লি পুলিশের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *