৩ দিনের মধ্যেই কি কমবে চিনির দাম? সিন্ডিকেট ও মজুতদারির খোঁজে তল্লাশিতে নেমে কড়া বার্তা প্রশাসনের

সাধারণ মানুষের হেঁশেলে রান্নার খরচ থেকে শুরু করে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার মিষ্টি—সবকিছুর পেছনেই এখন অস্বস্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চিনির লাফিয়ে বাড়তে থাকা দাম। শুধু চিনি নয়, বাজারের প্রায় সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ছে এবং জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি রুখতে আসরে নেমেছে রাজ্য প্রশাসন। কোথায় রয়েছে ত্রুটি আর কোন অদৃশ্য চক্রের কারসাজিতে জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে কড়া ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। লাগামছাড়া এই মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে এবং অবৈধ মজুতদারি চিরতরে থামাতে এবার সরাসরি ময়দানে নেমে পড়েছে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ বা ইবি (EB)।

এই প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার খাস কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ঝটিকা অভিযান চালান এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের শীর্ষ আধিকারিকরা। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মানিকতলা বাজার সহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে চাল, ধান, চিনি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বর্তমান বাজারদর এবং জোগান পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়। প্রশাসনের শীর্ষমহল থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অতিরিক্ত দাম কিছুতেই বরদাস্ত করা হবে না। চিনির দাম হঠাৎ কেন এতটা বেড়ে গেল, সরবরাহের কোন ধাপে গলদ রয়েছে কিংবা অসৎ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল।

নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, খুব শীঘ্রই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে চলেছে। সোমবার এক সাংবাদিক বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই চিনির বাজারদর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। প্রশাসনের দাবি, দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে থাকা মূল সমস্যা বা ‘লিকেজ’ কোথায় রয়েছে, তা ইতিমধ্যেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কোন স্তরে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে কিংবা কোথায় বেআইনিভাবে পণ্য লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করা হচ্ছে, তার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

কালোবাজারি ও বেআইনি মজুতদারি নির্মূল করতে গোটা রাজ্যজুড়ে রাজ্য টাস্ক ফোর্সকে আরও বেশি সক্রিয় করে তোলা হয়েছে। প্রশাসনিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ৭২টি সাব-ডিভিশন এবং ৩৫টি পুলিশ কমিশনারেট এলাকার আওতায় এই টাস্ক ফোর্স কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বাজারে চাল, ডাল ও চিনির মতো অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের দৈনিক জোগান, গুদামে মজুতের পরিমাণ এবং খুচরা বিক্রির দামের ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। কোথাও যদি নিয়ম ভেঙে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ ওঠে, তবে মুহূর্তের মধ্যে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবান্নের এই কঠোর নির্দেশ জারির পরেই ইবির আধিকারিকরা কলকাতার বাজারগুলোতে তল্লাশি শুরু করেন।

যদিও প্রাথমিক তদন্তের পর আধিকারিকদের একাংশ জানাচ্ছেন যে তাঁরা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন, তবে এখনও পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুতর কোনো অনিয়ম বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁরা হননি। প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো সরবরাহ শৃঙ্খলে কোথাও কোনো ফাঁকফোকর থাকলে তা দ্রুত মেরামত করা। ব্যবসায়ীরা যাতে কোনোভাবেই অবৈধ উপায়ে পণ্য মজুত করে সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলতে না পারেন, সেদিকে কড়া নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে।

বাজারদর স্থিতিশীল করার পাশাপাশি ক্রেতা সাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতেও বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে রাজ্য সরকার। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গোটা রাজ্যজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রেতা সুরক্ষা সপ্তাহ পালন করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাঁদের অধিকার ও ন্যায্য মূল্য সম্পর্কে আরও বেশি ওয়াকিবহাল হতে পারবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *