বিদ্যুৎ সঙ্কটের পরেই মারাত্মক গ্যাস সঙ্কটে ধুঁকছে বাংলাদেশ! বন্ধ একাধিক কারখানা, সংকটে খাদ্য নিরাপত্তা

বিদ্যুৎ সঙ্কটের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এবার এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। গ্যাসের তীব্র অভাবের জেরে শিল্প উৎপাদন, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সার উৎপাদন এবং দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা: পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আশুগঞ্জ সার কারখানায়। একসময় চব্বিশ ঘণ্টাই কর্মমুখর থাকা এই বিশাল কারখানাটি গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যত নিস্তব্ধ ও বন্ধ পড়ে রয়েছে। দেশের ১৭ কোটি মানুষের কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সার উৎপাদনে এই কারখানার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে এখানে ১,২০০-র বেশি কর্মী কাজ করতেন এবং প্রতিদিন ১,০০০ টনেরও বেশি সার উৎপাদিত হতো। কিন্তু গ্যাসের অভাবে ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকেই কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় এর পরিকাঠামো এখন মরচে পড়া জংধরা অবয়বে পরিণত হয়েছে।
গ্যাস সংকটের মূল কারণ কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই উৎপাদন কমছিল। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানিতে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতের জেরে বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটেছে। সব মিলিয়ে গ্যাসের অভাবে বাংলাদেশের মোট ছ’টি বড় ইউরিয়া সার কারখানা হয় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়েছে, না হয় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে হয়েছে।
অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
-
পোশাক শিল্পে ধাক্কা: গ্যাস সংকটের প্রভাব কেবল সার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হওয়ায় এবং দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই এই খাত থেকে আসায় শত শত টেক্সটাইল ও বস্ত্র কারখানা উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
-
বিদ্যুৎ ও লোডশেডিং: গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে না পারায় দেশজুড়ে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অগস্টে সরকারের পক্ষ থেকে শপিং মল নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগে বন্ধ রাখার মতো কড়া নির্দেশিকা জারি করতে হয়েছে।
-
গৃহস্থালি ও পরিবহণ: বিদ্যুৎ, শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের পাশাপাশি গৃহস্থালির কাজে এবং গ্যাসচালিত অটো ও যানবাহনেও জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস না পেয়ে বহু চালক ক্ষোভে রাস্তা অবরোধ পর্যন্ত করেছেন।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং কৃষিব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি এই প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি দ্রুত মোকাবিলা করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।