প্রাক্তন প্রেমিকার বিয়েতে বোমাতঙ্ক! হোম থিয়েটারের গিফট প্যাক খুলতেই বরের উড়ে যাওয়ার নেপথ্যের ভয়ঙ্কর গল্প

প্রতিশোধের আগুনে পুড়তে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই সর্বস্বান্ত হলেন ৩৩ বছর বয়সি এক যুবক। প্রাক্তন প্রেমিকার বিয়ের আসরে উপহার হিসেবে পাঠানো একটি হোম থিয়েটার সিস্টেমের ভেতরে লুকিয়ে রাখা আইইডি (IED) বিস্ফোরণে নববিবাহিত বর ও তাঁর ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত সারজু মারকামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনাল আদালত। ছত্তিশগড়ের কবীরধাম জেলার এই রোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে।

প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের ছক
মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলার ছাপলা গ্রামের বাসিন্দা সারজু মারকামের সঙ্গে ছত্তিশগড়ের এক তরুণীর পূর্বে পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং ওই যুবতী সারজুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পারিবারিকভাবে হেমেন্দ্র মেরাভি নামে অন্য এক যুবকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নিজের এই অপমান ও প্রত্যাখ্যান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি সারজু। মনে মনে চরম প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে তিনি এক ভয়াবহ ছক কষে ফেলেন।

পেশায় অটো মেকানিক এবং স্টোন ক্রাশারে কাজ করার সুবাদে বিস্ফোরক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আগে থেকেই ছিল সারজুর। সেই জানাশোনাকে কাজে লাগিয়েই সে বাজির বারুদ, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং পেট্রোল একসঙ্গে মিশিয়ে একটি শক্তিশালী রিমোট বা সুইচলেস আইইডি ডিভাইস তৈরি করে। এরপর বালাঘাটের একটি দোকান থেকে একটি নতুন হোম থিয়েটার কিনে তার ভেতরে অত্যন্ত সুকৌশলে ওই বিস্ফোরকগুলি লুকিয়ে ফেলে। তারপর উপহারের চটকদার মোড়কে তা প্যাক করে ফেলা হয়।

বিয়ের উপহার থেকে মুহূর্তেই নরকান্ড
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে ছত্তিশগড়ের চামারি গ্রামে ঘটা করে বসেছিল সেই বিয়ের আসর। অভিযুক্ত সারজু বাইকে করে সোজা বিয়ের আসরে পৌঁছে ওই হোম থিয়েটারের বাক্সটি রেখে চুপিসারে চম্পট দেয়। বিয়ের অনুষ্ঠান মিটে যাওয়ার তিন দিন পর, অর্থাৎ ৩ এপ্রিল সকালে নববিবাহিত বর হেমেন্দ্র মেরাভি এবং তাঁর দাদা রাজকুমার উপহারটি কেমন হয়েছে তা দেখতে সেটি আনবক্স করেন।

ঘরের সকেটে হোম থিয়েটারের প্লাগটি গুঁজে সুইচ অন করতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় সেটি। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে ঘরের পাকা ছাদ ও দেওয়াল উড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই করুণ মৃত্যু হয় বর হেমেন্দ্রর। এরপর গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মারা যান তাঁর দাদা রাজকুমারও। এক শিশুসহ পরিবারের অন্য পাঁচজন সদস্যও এই বিধ্বংসী বিস্ফোরণে গুরুতর জখম হন। হাসিখুশি ও আনন্দমুখর একটি বিয়ের ঘর নিমেষেই পরিণত হয় শ্মশানে।

তদন্ত ও আদালতের রায়
ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বয়ানের সূত্র ধরে নিখুঁত তদন্ত চালিয়ে অভিযুক্ত সারজুকে পাকড়াও করা হয়। ফরেনসিক পরীক্ষাতেও হোম থিয়েটারের ভেতর শক্তিশালী বিস্ফোরক থাকার নিখুঁত প্রমাণ মেলে।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট কবীরধাম আদালতের অতিরিক্ত সেশন জজ গীতেশ কুমার কৌশিক প্রধান অভিযুক্ত সারজু মারকামকে খুন, হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরক আইন-১৯০৮-এর বিভিন্ন ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত তাকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। হিংসা ও অন্ধ প্রতিশোধ যে মানুষকে কতটা পিশাচ করে তুলতে পারে, ছত্তিশগড়ের এই রায় যেন তারই এক নির্মম দলিল হয়ে রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *