হাঁটু জলে ডুবছে বাড়ি, স্কুল যেতে জামাকাপড় বদলাতে হয় পড়ুয়াদের! মুর্শিদাবাদের এই গ্রামে বর্ষ মানেই অভিশাপ।

বাড়ির উঠানে পা রাখলেই ডুবে যাচ্ছে পায়ের পাতা। আর রাস্তার দিকে এগোলেই হাঁটু সমান জল! কোথাও পুকুরের জল উপচে পড়ছে রাস্তার উপর, আবার কোথাও সেই জল ঢুকে পড়ছে মানুষের ঘরবাড়ির ভিতরও। জলের সঙ্গে মিশে রয়েছে নোংরা আবর্জনা, আর তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাপ, ব্যাঙ ও কীটপতঙ্গের আতঙ্ক। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা-১ ব্লকের দেবকুণ্ডু পঞ্চায়েতের বড়ুয়া উত্তরপাড়ার ছবিটা এখন এমনই ভয়াবগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে বর্ষা এলেই এই দুর্ভোগের শিকার হতে হয় তাঁদের, আর প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে বারবার দরবার করেও মেলেনি কোনো স্থায়ী সমাধান।
স্কুলপড়ুয়াদের নাজেহাল অবস্থা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন এলাকার স্কুলপড়ুয়ারা। স্থানীয়দের দাবি, রাস্তার উপর জমে থাকা জলের পরিমাণ এতটাই বেশি যে স্কুলের পোশাকে তা পার হওয়া কার্যত অসম্ভব। বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে অন্য পোশাক পরে বেরোতে হয় পড়ুয়াদের। জলমগ্ন রাস্তা পার হয়ে অপর পারে পৌঁছানোর পর স্কুলের পোশাক পরে গন্তব্যে যেতে হয় তাদের। স্কুল থেকে ফেরার কালেও একই ভাবে জল ঠেলে বাড়ি ফিরতে হয় খুদেদের। বর্ষার এই তিনটে মাস তাই এই পাড়ার বাসিন্দাদের কাছে জলযন্ত্রণার সমার্থক হয়ে উঠেছে।
কেন এই জলবন্দি দশা? স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমস্যার মূল কারণ ভেঙে পড়া নিকাশি ব্যবস্থা। একসময় পাড়ার জল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমির উপর দিয়ে তৈরি নিকাশি নালা হয়ে সোজা গিয়ে পড়ত বিলে। কিন্তু বছর দুয়েক আগে সেই জমির মালিক নিজের জায়গা ঘিরে দেওয়ায় নিকাশি পথটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টির জল বেরোনোর রাস্তা না পেয়ে জমে থাকতে শুরু করে জনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
এর পাশাপাশি সমস্যার অন্যতম কারণ রাস্তার দু’পাশে থাকা দুটি পুকুর। দক্ষিণপাড়ার পুকুরে এলাকার বিস্তীর্ণ অংশের জল এসে জমে। পুকুরের চারপাশে উপযুক্ত গার্ডওয়াল না থাকায় জল উপচে রাস্তার উপর দিয়ে বয়ে যায়। অন্য দিকে, উত্তরপাড়ার পুকুরটিও তার জল ধারণক্ষমতা হারালে সেই জল রাস্তার উপর উঠে আসে। শেষ পর্যন্ত রাস্তা ডুবে জল ঢুকে পড়ে সাধারণ মানুষের ঘরের উঠানে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও প্রশাসনের আশ্বাস স্থানীয় বাসিন্দা মহম্মদ আলি বক্স জানান, নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই তাঁদের দুর্গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। গত বছর পঞ্চায়েত মেশিন দিয়ে জল বের করায় কিছুদিনের জন্য স্বস্তি মিললেও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, গৃহবধূ আজিরা খাতুনের কথায়, খুব কষ্ট দিন কাটছে। বাড়ির দরজায় জল দাঁড়ানোর ফলে রান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজ সবই ব্যাহত হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে সাপ ও ব্যাঙের আতঙ্ক।
তবে এই সংকটের মাঝেও আশার আলো দেখিয়েছেন মুক্তাহারা বেওয়া নামের এক স্থানীয় মহিলা। তিনি নিকাশি নালার জন্য নিজের জমি দিতে রাজি হয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষ এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়।
পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত সমিতি, বিধায়ক থেকে বিডিও— বিভিন্ন মহলে বারবার অভিযোগ জানিয়েও কাজের কাজ কিছু হয়নি বলে দাবি বাসিন্দাদের। দেবকুণ্ডু গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, আপাতত মেশিন চালিয়ে দ্রুত জল সরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বেলডাঙা-১ ব্লকের বিজেপি বিধায়ক ভরত ঝাওর তৃণমূলকে নিশানা করে পরিস্থিতি নিজে গিয়ে খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন।
পাম্প চালিয়ে সাময়িক জল নিষ্কাশন কি আদৌ সমস্যার প্রকৃত সমাধান, নাকি স্থায়ী নিকাশি ব্যবস্থার মাধ্যমে মিলবে মুক্তি— সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বড়ুয়া উত্তরপাড়ার প্রতিটি বাসিন্দার মনে।