বার্লিনে রুশ হাউসে কড়াকড়ি করলেই মস্কোয় বন্ধ হবে গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউট? জার্মানির সামনে চরম কূটনৈতিক সংকট!

জার্মান রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে ফ্রিডরিশস্ট্রাসের প্রায় ৩০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সাততলা বিশাল ভবনটি চালু হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। কিন্তু দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর এবার সেই ভবনটি নিয়েই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফরাসি ও জার্মান কর্তৃপক্ষের তরফে এই ভবনটিকে সরাসরি রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে, যা নিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল পড়ে গেছে।
জার্মান করদাতার টাকায় রুশ প্রচার? ফ্রিডরিশস্ট্রাসের এই কৌশলগত ভবনটির আইনি মালিকানা জার্মানির হাতে থাকলেও, এটি পরিচালনা করে রাশিয়ার একটি সরকারি সংস্থা—’রোসসোত্রুদনিচেস্তভো’ (Rossotrudnichestvo)। মূলত বিদেশে বসবাসকারী রুশভাষী মানুষ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রক্ষা করাই এই সংস্থার কাজ। তবে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা জার্মানিতে কূটনীতিকদের মতো বিশেষ আইনি সুরক্ষা ভোগ করেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর থেকেই এই সংস্থাটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) নিষেধাজ্ঞা তালিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও মস্কো বরাবরই এই ভবনটিকে দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক ও ‘সাংস্কৃতিক দূতাবাস’ বলে দাবি করে আসছে।
এর আগে বার্লিনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এই ভবনের সিনেমা হলের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, সেখানকার একটি হলোকাস্ট চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে ইউক্রেনীয় নাগরিকদের সুকৌশলে নাৎসি হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়েছিল, যা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়।
দ্বিপক্ষীয় চুক্তির গ্যাঁড়াকলে জার্মানি জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্টিন গিজে এই সপ্তাহের শুরুতে বার্লিনে এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়েছেন, জার্মান সরকার সাম্প্রতিককালে জার্মানিতে সক্রিয় রুশ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। রুশ হাউস ঠিক কোন আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা এখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।
তবে এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া জার্মানির পক্ষে কেন অত্যন্ত কঠিন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গিজে। জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পত্তি সংক্রান্ত এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে, যা সহজে বাতিল করা সম্ভব নয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই যেমন বার্লিনে রুশ হাউস পরিচালিত হয়, তেমনই মস্কোয় পরিচালিত হয় জার্মানির স্বনামধন্য ‘গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউট’ (Goethe-Institut)। বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মানি যদি বার্লিনের রুশ হাউসের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়, তবে তার সরাসরি ও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মস্কোয় অবস্থিত জার্মান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটির ওপর।
অতীতেও হয়েছে সংঘাতের চেষ্টা ইতিহাস বলছে, এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে অতীতেও স্নায়ুযুদ্ধ দেখা গেছে। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে বার্লিন পাবলিক প্রসিকিউটরের দপ্তর রুশ হাউসের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে এবং এর ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দেয়। তার জেরে ক্ষুব্ধ মস্কোও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়ায় অবস্থিত গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউটের হিসাব জব্দ করে এবং জার্মান কর্মকর্তাদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর ফলে রাশিয়ায় গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল।
সরাসরি যোগাযোগ আজ প্রায় অসম্ভব জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে একটি সাংস্কৃতিক চুক্তি রয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের সাধারণ মানুষ, শ্রমিক সংগঠন, শিল্পী সমাজ এবং রাজনৈতিক ফাউন্ডেশনগুলির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ গত কয়েক বছরে রাশিয়া জার্মানির বেশ কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক ফাউন্ডেশনকে ‘অবাঞ্ছিত সংগঠন’ বলে ঘোষণা করেছে। বর্তমান রুশ আইন অনুযায়ী, কেউ যদি ওই সমস্ত সংগঠনের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্কও রাখে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি মামলা দায়ের হতে পারে। সব মিলিয়ে, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে বার্লিন ও মস্কোর সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।