১৮ কিমি হাঁটা পথ, হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি! জল্পেশের শ্রাবণী মেলায় এবার যা হল, তা ইতিহাস!

শ্রাবণের শেষ সোমবার। উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন শৈবতীর্থ জল্পেশ মন্দির চত্বরে আজ যেন উপচে পড়া জনস্রোত। তিস্তা নদীর ঘাট থেকে শুরু করে জল্পেশ মন্দির—প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ জুড়ে কাঁধে জল নিয়ে হেঁটে চলেছেন হাজার হাজার পুণ্যার্থী। শুধু এ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকেই নয়, প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভুটান থেকেও ভক্তেরা ছুটে এসেছেন জল্পেশে দেবাদিদেব মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে। শেষ সোমবারের এই বিপুল ভিড় একদিকে যেমন মন্দির চত্বরে উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে, তেমনই স্বস্তির হাসি ফুটিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের মুখে।
রেকর্ড ভিড় ও প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা: এবারের শ্রাবণ মাসে পাঁচটি সোমবার থাকায় প্রথম থেকেই পুণ্যার্থীর সংখ্যা অতিরিক্ত হবে বলে অনুমান করেছিল প্রশাসন ও মন্দির ট্রাস্টি বোর্ড। শেষ সোমবারে সেই ভিড় কার্যত সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এ বার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তিস্তা ঘাট থেকে ইন্দির মোড় পর্যন্ত জাতীয় সড়কের একটি অংশ ব্যারিকেড করে শুধু পুণ্যার্থীদের হাঁটার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। এর ফলে যান চলাচল যেমন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, তেমনই বড় কোনো বিপত্তি ছাড়াই ভক্তরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পেরেছেন।
তিস্তা ঘাট থেকে জল সংগ্রহ ও বড় ছাড়: জল্পেশে জল ঢালার মূল নিয়ম হলো তিস্তা নদী থেকে জল নিয়ে পায়ে হেঁটে মন্দিরে পৌঁছনো। ভোর থেকেই তিস্তার ঘাটে ভক্তদের ঢল নামে। স্নান সেরে জল নিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটারের পদযাত্রা। পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য এ বার তিস্তা ঘাটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগে তিস্তা থেকে জল নেওয়ার জন্য পুণ্যার্থীদের টিকিট কাটতে হতো, এ বার সেই নিয়ম তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে ভক্তরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্নান করে জল নিয়ে যেতে পেরেছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে।
অনলাইন টিকিট ও হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি: ভিড় সামলাতে এ বার মন্দির কর্তৃপক্ষ প্রথমবার অনলাইনে টিকিটের ব্যবস্থা করেছিল। পাশাপাশি মন্দিরে প্রবেশের টিকিটের দামও ৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ৪০ টাকা করা হয়েছে, যাতে লাইনে দাঁড়ানোর ঝক্কি ও খরচ দুই-ই কমে। অন্যদিকে, এ বারের মেলার অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে হেলিকপ্টার থেকে পুণ্যার্থীদের ওপর ফুল ছিটানো হয়, যা জল্পেশের প্রচারকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ও ব্যবসায়ীদের হাসি: জল্পেশের এই শ্রাবণী মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, উত্তরবঙ্গের স্থানীয় অর্থনীতিরও বড় চালিকাশক্তি। হোটেল, দোকান, পুজোর সামগ্রী থেকে শুরু করে পরিবহণ—এই মেলার ওপর নির্ভর করেই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশের সারা বছরের রোজগার হয়। এ বার রেকর্ড ভিড় হওয়ায় বিকিকিনিও বেশ ভালো হয়েছে, ফলে ব্যবসায়ীদের মুখে চওড়া হাসি দেখা গিয়েছে।
দার্জিলিং থেকে আসা পুণ্যার্থী সিমরন থাপা বলেন, “এ বার পরিকাঠামো ও প্রশাসন উভয়েরই সাহায্য দারুণ ছিল, কোনো সমস্যা ছাড়াই জল ঢালতে পেরেছি।” সব মিলিয়ে, ধর্মীয় আবেগ, রেকর্ড পুণ্যার্থী সমাগম এবং জমজমাট ব্যবসার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলো শ্রাবণের শেষ সোমবারের জল্পেশ উৎসব।