“ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই!”-হতাশায় চাকরি খোঁজা ছেড়ে দিয়েছে ভারতের ১০ কোটি তরুণ

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারি চাকরিতে নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি—সর্বত্রই এখন ফুঁসে উঠেছে জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম। তবে এই বিক্ষোভ কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভারতের গোটা তরুণ সমাজের বেঁচে থাকার এক বৃহত্তর লড়াই। দেশের বিশাল যুবশক্তিকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর হাতিয়ার হিসেবে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা হলেও, বর্তমান বাস্তবের ছবিটা অত্যন্ত হতাশাজনক।
কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ও গ্র্যাজুয়েটদের দুর্গতি
ভারতের ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি হলেও, এর মধ্যে কাজের সুযোগ রয়েছে মাত্র ৬৭ কোটির কাছাকাছি। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট বেকারদের মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশই যুবসমাজ। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অথচ একসময় উচ্চশিক্ষা বা ডিগ্রি মানেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ বলে মনে করা হতো। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশ ধনী হলেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, যা অর্থনীতির ভাষায় ‘লো এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি অব গ্রোথ’-এর স্পষ্ট উদাহরণ।
কেন তৈরি হচ্ছে এই সংকট?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে একাধিক গভীর কারণ জড়িয়ে রয়েছে:
-
উৎপাদন খাতের পিছিয়ে পড়া: ভারত কৃষির পর সরাসরি সেবা ক্ষেত্রে (Service Sector) প্রবেশ করায় উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাত শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়নি। জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১৭ শতাংশ থেকে কমে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে।
-
এআই ও প্রযুক্তির কোপ: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং পরিকাঠামো ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মানুষের কাজের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
-
শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি: বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম বর্তমান বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ডিগ্রি পেলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে চাকরি পাচ্ছেন না তরুণরা। অন্যদিকে, সরকারের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলিও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, কাজের আশায় বারবার হতাশ হয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ এখন চিরতরে চাকরি খোঁজা ছেড়ে দিয়েছেন। ২০১২ সালে এই সংখ্যা পাঁচ কোটি থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো সঠিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা গেলে এই বিশাল যুবশক্তির সম্ভাবনাই আগামী দিনে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।