১৩৫ থেকে সরাসরি ৮৯ কেজি! ওজন কমিয়ে চমকে দিলেন নিতিন গড়করি, কী করে সম্ভব হলো এই রূপান্তর?

একসময়ে তাঁর ওজন ছিল প্রায় ১৩৫ কেজি। আর বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৯ কেজিতে। অর্থাৎ, কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মের জেরে একলাফে প্রায় ৪৬ কেজি ওজন ঝরিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করি (Nitin Gadkari)। তবে কোনো শর্টকাট ‘ক্র্যাশ ডায়েট’ বা রাতারাতি রোগা হওয়ার কোনো অস্বাস্থ্যকর কৌশল নয়—নিয়মিত ব্যায়াম, চরম শৃঙ্খলা এবং জীবনযাপনের আমূল পরিবর্তনকেই নিজের এই অবিশ্বাস্য রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি বলে জানিয়েছেন তিনি।
কোভিড অতিমারি পাল্টে দিল জীবন
সম্প্রতি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ও কোরিয়োগ্রাফার ফারহা খানের ইউটিউব চ্যানেলে নিজের দৈনন্দিন জীবন ও ফিটনেস জার্নি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন গড়করি। তিনি জানান, কাজের ব্যস্ততা যতই থাকুক এবং গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক চললেও তিনি সকালে উঠে শরীরচর্চা কখনো বাদ দেন না। এমনকি আগের দিন রাত ১টা পর্যন্ত মিটিং থাকলেও পরদিন ঠিক সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে তিনি প্রায় দু’ঘণ্টা থেকে আড়াই ঘণ্টা টানা ব্যায়াম করেন।
গড়করির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, একসময়ে তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত অপরিকল্পিত এবং অনিয়ন্ত্রিত। কাজের চাপে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে তাকানোর ফুরসত পেতেন না। তবে কোভিড অতিমারি তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ওই সংকটজনক সময়ে বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে হারানোর পরেই তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন যে, পেশাগত সাফল্য বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার চেয়েও সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন বেঁচে থাকা অনেক বেশি জরুরি। আর সেই দিন থেকেই শরীরচর্চাকে দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ করে তোলেন। তাঁর সাফ কথা, “স্বাস্থ্যই আসল সম্পদ।”
কী রয়েছে গড়করির ফিটনেস রুটিনে?
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর প্রতিদিনের শরীরচর্চার তালিকায় রয়েছে প্রাণায়াম, স্ট্রেচিং এবং পেশি শক্তিশালী করার বিভিন্ন ধরনের অনুশীলন। কোনো রকম নিজে নিজে এক্সারসাইজ না করে তিনি সর্বদা বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানেই নিয়মিত শরীরচর্চা করে থাকেন। এর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও সামগ্রিক জীবনযাপনেও তিনি এনেছেন বড় পরিবর্তন।
তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রতিদিন আড়াই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ব্যায়াম করা কি সাধারণ মানুষের পক্ষে বাস্তবসম্মত? স্বাস্থ্য ও ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের মতে, নিতিন গড়করির এই কড়া রুটিন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক, তবে তা হুবহু সকলের পক্ষে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য প্রতিদিন মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট পরিকল্পিত শরীরচর্চাই যথেষ্ট হতে পারে।
সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত হাঁটা বা কার্ডিয়ো ব্যায়ামের সঙ্গে শক্তিবর্ধক অনুশীলন এবং শরীর সচল রাখার হালকা ব্যায়াম মিলিয়ে করা অনেক বেশি কার্যকর। চিকিৎসকদের মতে, কতক্ষণ ব্যায়াম করা হচ্ছে, তার চেয়েও ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি নিয়মিত এবং দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসে পরিণত করা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কম খেয়ে বা অতিরিক্ত কার্ডিয়ো করে দ্রুত ওজন কমাতে গেলে লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। এতে পেশির ক্ষয় হতে পারে এবং পরবর্তীতে ওজন আবার দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমানো, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং মানসিক চাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখা—সবকিছুর মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণের একমাত্র নিরাপদ পথ।
পাশাপাশি মনে রাখা দরকার, নিতিন গড়করির আড়াই ঘণ্টার এই কঠিন ব্যায়ামের রুটিন সকলের শারীরিক গঠনের জন্য উপযোগী নাও হতে পারে। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, অস্থিসন্ধির সমস্যা কিংবা অন্যান্য অসুস্থতার ইতিহাস বিচার করেই প্রত্যেকের ব্যায়ামের ধরন ও সময় নির্ধারণ করা উচিত। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হুট করে কোনো কঠোর শরীরচর্চা শুরু করা একেবারেই নিরাপদ নয়।
সবমিলিয়ে, নিতিন গড়করির এই ওজন কমানোর গল্পটি কেবল ১৩৫ কেজি থেকে ৮৯ কেজিতে নেমে আসার সাধারণ কোনো সংখ্যাতত্ত্ব নয়; বরং এটি একটি অসংযত ও অনিয়মিত জীবনধারা থেকে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসচেতন ও শৃঙ্খলিত জীবনে ফিরে আসার এক দারুণ অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।