গাঁজা খেয়ে মাঝ আকাশে বিমান ওড়াতেন পাইলট! এয়ার ইন্ডিয়ার চরম গাফিলতিতে কড়া বার্তা কেন্দ্রের

ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার AI-2379 বিমানের পাইলট-ইন-কমান্ড (PIC)-এর বিরুদ্ধে গাঁজা খেয়ে বিমান চালানোর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। মাদক পরীক্ষায় ওই পাইলটের রক্তে মারিজুয়ানা বা গাঁজার উপস্থিতি প্রমাণিত হওয়ার পর এয়ার ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্র। সরকারের তরফে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, অপারেশনাল নিরাপত্তার বিন্দুমাত্র দায়িত্ব এড়ানো যাবে না এবং এয়ার ইন্ডিয়াকেই এর সম্পূর্ণ ‘দায়িত্ব নিতে হবে’। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে মন্ত্রক। পাশাপাশি, গোটা দেশের বিমান চালকদের জন্য DGCA-কে ডোপ টেস্টের কাঠামো দ্রুত পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঠিক কী ঘটেছিল AI-2379 বিমানে?

গত ৪ অগাস্ট ফুকেট থেকে ১৩৭ জন যাত্রী ও ৮ জন ক্রু সদস্যকে নিয়ে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার Airbus A320neo বিমানটি। ওডিশার আকাশসীমা অতিক্রম করার সময় বিমানটি আচমকাই মাঝ আকাশে প্রায় ৩০০ ফুট নীচে নেমে যায়। মুহূর্তের সেই তীব্র ঝাঁকুনিতে যাত্রী ও কেবিন ক্রু মিলিয়ে মোট ২৪ জন আহত হন।

প্রাথমিক ভাবে এটিকে আকস্মিক টার্বুলেন্স (Turbulence) বলে মনে করা হলেও তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য:

  • নেশায় ককপিটে বেসামাল: অভিযোগ উঠেছে, টেক–অফের কিছুক্ষণ পরেই নেশার ঘোরে ককপিটের মেঝেতে মোজা-জুতো খুলে পড়ে গিয়েছিলেন পাইলট।

  • ঘুম ও ওয়াশরুম: তদন্তে জানা গিয়েছে, বিমান চলাকালীন ওই পাইলট প্রায় ৩০-৩৫ মিনিট ঘুমিয়েছিলেন। ঘুম থেকে উঠে তিনি ওয়াশরুমে যান এবং পরে ফার্স্ট অফিসারের আসনের পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই হু-হু করে নীচে নেমে যায় বিমানটি।

  • কন্ট্রোল লিভারে চাপ: সিনিয়র পাইলটদের ধারণা, কো–পাইলটের সিটের পিছনের দিকে একাধিক কন্ট্রোল–লিভার থাকায়, বেসামাল পাইলটের হাত লেগে তিনবার হাইড্রলিক ফেলিওর হয়ে থাকতে পারে। নিচে নামার সময় ককপিটেই ছিটকে পড়েন ওই পাইলট, যদিও সেই অবস্থাতেও কো-পাইলটকে তিনি সঠিক নির্দেশই দিয়েছিলেন।

  • সতর্কবার্তা ও অ্যালার্ট: শুধু ডোপ টেস্ট বা পাইলটের আচরণই নয়, ওই যাত্রার সময়ে ১১ বার ওয়ার্নিং বেল, অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং হাইড্রলিক সিস্টেমের একাধিক অ্যালার্ট নিয়ে গভীর তদন্ত শুরু হয়েছে।

পাইলটের সাফাই ও ঘুম নিয়ে সমস্যা

তদন্তকারীদের মুখোমুখি হয়ে অভিযুক্ত পাইলট দাবি করেছেন যে তিনি ফুকেটে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে পারেননি। ব্যক্তিগত নানা কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর ঘুমের সমস্যা ছিল এবং চিকিৎসকের পরামর্শেই তিনি ঘুমের ওষুধ সেবন করতেন। তবে তিনি নিয়ম মেনে বিমান সংস্থাকে এই প্রেসক্রিপশনের কথা জানিয়েছিলেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

পাইলটের বক্তব্য অনুযায়ী, শিডিউলের কারণে পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। প্রথম ফ্লাইটের জন্য তাঁকে রাত ১২টা ১০ মিনিটে এবং দ্বিতীয় ফ্লাইটের আগে ভোর ৩টেয় উঠতে হয়েছিল। বর্তমানে ওই দুই পাইলটকেই ডিউটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রের কঠোর পদক্ষেপ ও DGCA-র নিয়মে বদল

সাম্প্রতিক এই ঘটনার জেরে বিমান পরিবহণের নিরাপত্তা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। গত বছর আমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দুর্ঘটনায় ২৬০ জনের মৃত্যুর স্মৃতি উসকে দেওয়ায় কেন্দ্র বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে।

অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক ডিরোজেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন (DGCA)-কে ড্রাগ-টেস্টিং বা মাদক পরীক্ষার নিয়ম দ্রুত পর্যালোচনা করার নির্দেশ দিয়েছে। বাধ্যতামূলক পরীক্ষার পরিধি আরও বাড়িয়ে নিয়মিত ও সন্দেহভাজন বিমানকর্মীদের আরও ঘন ঘন ডোপ টেস্টের আওতায় আনার কাজ চলছে, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের মারাত্মক গাফিলতি কঠোর হাতে দমন করা যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *