স্বাধীনতা বা প্রজাতন্ত্র দিবসে কেন ঠিক ২১ বারই বাজে কামানের গর্জন? জানুন এর পেছনের রোমহর্ষক ইতিহাস

প্রতি বছর ১৫ অগস্ট স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় এবং ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে কর্তব্য পথে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর আকাশ কাঁপিয়ে শোনা যায় পরপর কামানের গর্জন। এই ‘২১ গান স্যালুট’ বা একুশটি কামানের অভিবাদন ভারতের যেকোনো জাতীয় অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রাচীন এবং মর্যাদাপূর্ণ সামরিক ঐতিহ্য। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, ঠিক একুশবারই কেন এই স্যালুট দেওয়া হয়? এর আসল ইতিহাসটাই বা কী?

কোথা থেকে এল এই ২১ গান স্যালুট প্রথা?
এই ঐতিহাসিক প্রথার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে বহু শতাব্দী পুরনো নৌযুদ্ধের যুগে। সেই আমলে কোনো যুদ্ধজাহাজ যখন কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ বন্দরে প্রবেশ করত, তখন তারা সমুদ্রের দিকে ফাঁকা কামান দেগে নিজেদের শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য প্রকাশ করত। মূলত কামানের গোলা ছুড়ে অস্ত্রাগার খালি করে দেওয়ার অর্থই ছিল যে, ওই জাহাজগুলির পক্ষে তৎক্ষণাৎ কোনো আক্রমণ চালানো অসম্ভব এবং তারা সম্পূর্ণভাবে বন্ধুভাবাপন্ন।

ধীরে ধীরে এই প্রথা এক অনন্য সামরিক সৌজন্যে পরিণত হয়। শুরুর দিকে নৌবাহিনীতে মাত্র সাতটি কামানের স্যালুট প্রচলিত ছিল। তবে স্থলভাগের ব্যাটারিগুলি একটি সামুদ্রিক গোলার বিপরীতে তিনটি করে গোলা ছুড়তে পারত, যেখান থেকেই মূলত ‘সাত গুণিতক তিন’ অর্থাৎ ২১ সংখ্যাটির প্রচলন হয়। পরবর্তীকালে এই ২১ গান স্যালুট বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান, রাজা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানের প্রতীক হিসেবে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নেয়।

স্বাধীনতার পর বদলে গেল এই প্রথার অর্থ:
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে এই কামানের সালামের প্রথাটি ছিল মূলত ব্রিটিশ আধিকারিক ও দেশীয় রাজাদের মর্যাদাক্রম বা স্ট্যাটাস নির্ধারণের মাপকাঠি। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ঔপনিবেশিক অর্থ পুরোপুরি বদলে যায়। স্বাধীন ভারত এই গৌরবময় সামরিক ঐতিহ্যকে সযত্নে টিকিয়ে রাখলেও, এটিকে সম্পূর্ণ নতুন অর্থে একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্র দিবসের মাহাত্ম্য:
১৫ অগাস্ট: ১৯৪৭ সালের এই দিনেই ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্তি পায় ভারত। দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবেই ২১ গান স্যালুট দেওয়া হয়, যা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় পতাকার প্রতি সশস্ত্র বাহিনীর গভীর সম্মান প্রদর্শন করে।

২৬ জানুয়ারি: ১৯৫০ সালের এই দিনে ভারতের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় এবং দেশ পূর্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। দিল্লির কর্তব্য পথে রাষ্ট্রপতি জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গেই বেজে ওঠে ২১ গান স্যালুট। অর্থাৎ, ১৫ অগস্ট আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক, আর ২৬ জানুয়ারি সংবিধান ও প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক।

আসলেই কি একুশটি কামান ব্যবহার করা হয়?
নামের সঙ্গে মিল থাকলেও, বাস্তবে সবসময় ২১টি আলাদা কামান থেকে গোলা ছোড়া হয় না। ভারতের নিজস্ব সামরিক প্রথায় তুলনামূলক কম সংখ্যক আধুনিক ফিল্ড গান ব্যবহার করা হয় এবং সেগুলির মাধ্যমেই মোট একুশটি রাউন্ড ফায়ার করা হয়। সাধারণত কয়েকটি কামান নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা মেনে পালা করে গোলাগুলি চালায় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি জাতীয় সঙ্গীতের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা হয়।

দেশীয় কামানে নতুন অধ্যায়:
এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত অস্ত্রের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় বদল। ২০২৩ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে ২১ গান স্যালুটের জন্য প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ১০৫ মিমি ইন্ডিয়ান ফিল্ড গানস (Indian Field Guns) ব্যবহার করা হয়। এর ফলে শতাব্দীপ্রাচীন এই সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ‘আত্মনির্ভরতা’র বার্তাটিও সুন্দরভাবে যুক্ত হয়েছে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই ২১ গান স্যালুট কেবল কিছু কামানের বিকট শব্দমাত্র নয়। জাতীয় পতাকা দেশের পরিচয়, জাতীয় সঙ্গীত আমাদের ঐক্যের প্রতীক, আর এই একুশটি কামানের গর্জন হলো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও তার সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানের সবচেয়ে জোরালো প্রকাশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *