“তাঁর সততা মোদীর ঠিক উল্টো!” মনমোহন সিংয়ের ক্লিন চিট প্রাপ্তি নিয়ে বড় বার্তা কংগ্রেস নেত্রীর

দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh) সততা এবং তাঁর আমলের কার্যপদ্ধতি নিয়ে বড় মন্তব্য করলেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের প্রধান সোনিয়া গান্ধী (Sonia Gandhi)। একটি নামী ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক নিবন্ধে সোনিয়া গান্ধী সওয়াল করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে কয়লা ব্লক বণ্টন মামলা থেকে মনমোহন সিংয়ের সম্পূর্ণ ক্লিন চিট পাওয়ার ঘটনাটি এক ঐতিহাসিক ও ন্যায়বিচারপূর্ণ মুহূর্ত। তাঁর মতে, ইতিহাস সবসময় ড. মনমোহন সিংকে একজন অত্যন্ত নম্র, ভদ্র এবং অসাধারণ সততার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনে রাখবে।

কয়লা কেলেঙ্কারি ও সুপ্রিম কোর্টের রায়
নিবন্ধে সোনিয়া গান্ধী উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৬ সালের ২৯শে জুলাই ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওই দিন সুপ্রিম কোর্ট সিবিআই-এর ক্লোজার রিপোর্টের ভিত্তিতে কথিত কয়লা কেলেঙ্কারি মামলায় মনমোহন সিংকে দেওয়া ক্লিন চিট বহাল রেখেছে।

সোনিয়া গান্ধীর অভিযোগ, কোনো সুনির্দিষ্ট বা শক্তপোক্ত কারণ ছাড়াই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে অতীতে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। এমনকি সিবিআই-এর ক্লোজার রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করা এবং পর্যাপ্ত কারণ ছাড়াই মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করার দায়ে শীর্ষ আদালত অধস্তন আদালতকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে বলে তিনি জানান।

সুপরিকল্পিত অপপ্রচারের অভিযোগ ও মোদী সরকারের সমালোচনা
মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে অতীতে চলা প্রচারণাকে “জনপরিসরের অন্যতম দুঃখজনক অধ্যায়” বলে অভিহিত করেছেন সোনিয়া গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, এই প্রচারণা কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ এবং তৎকালীন বিরোধীদের একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত ষড়যন্ত্র।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সরাসরি আক্রমণ করে সোনিয়া বলেন:

রেইনকোট মন্তব্য: ২০১৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি রাজ্যসভায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী মোদীর করা ‘রেইনকোট পরে স্নান করা’ সংক্রান্ত মন্তব্যটি ভারতীয় সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম নিম্নমানের ও নিকৃষ্টতম ঘটনা।

তদন্তকারী সংস্থার অপব্যবহার: মোদী সরকারের আমলে ইডি (ED) এবং সিবিআই (CBI)-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরমভাবে অপব্যবহার করা হচ্ছে।

সততার পার্থক্য: বর্তমান সরকারের কার্যপদ্ধতির সঙ্গে মনমোহন সিংয়ের সততা এবং জবাবদিহিতার রেকর্ডের কোনো তুলনাই চলে না।

ইউপিএ আমলের অর্থনৈতিক সাফল্য ও বাকস্বাধীনতা
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের দশ বছরের শাসনকালের ভূয়সী প্রশংসা করে সোনিয়া গান্ধী বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন:

দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ভারত নিজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল। ইউপিএ সরকারের ১০ বছরের প্রবৃদ্ধি তার আগের ১২ বছরের তুলনায় অনেক দ্রুত ছিল এবং এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য সীমার বাইরে এসেছিল।

ঐতিহাসিক আইনসমূহ: শিক্ষার অধিকার (RTE), ওবিসি (OBC) সংরক্ষণ এবং জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন (NFSA, ২০১৩)-এর মতো জনকল্যাণমূলক আইন তাঁর আমলেই বাস্তবায়িত হয়।

গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা: মনমোহন সিং সংসদ ও গণমাধ্যমের কাছে সবসময় জবাবদিহি করতেন। কোনো পূর্বনির্ধারিত প্রশ্ন ছাড়াই তিনি শতাধিক সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। তাঁর আমলে সুশীল সমাজ এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাও সরকারের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার পেত।

শেষ বার্তা
নিবন্ধের শেষে সোনিয়া গান্ধী আক্ষেপ প্রকাশ করে লেখেন যে, ড. মনমোহন সিং আজ এই দিনটি দেখার জন্য এবং তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে জাতিকে পথ দেখানোর জন্য আমাদের মধ্যে নেই (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের ২৭শে ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন)। তবে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে মনমোহন সিং যে ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন, তা আজ দিন দিন অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে—এটাই কংগ্রেস শিবিরের কাছে বড় সান্ত্বনার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *