চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলায় সিবিআইয়ের চার্জশিট দাখিল! ইউপি-র ভাড়াটে খুনিদের সুপারি দিয়ে খুনের নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য

পশ্চিমবঙ্গ তথা জাতীয় রাজনীতির অন্যতম হাই-প্রোফাইল মামলা—তৎকালীন বিরোধী দলনেতা তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী (PA) চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলায় সিবিআই (CBI) কলকাতার একটি বিশেষ আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জশিট দাখিল করেছে। এই চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল মামলায় মোট ১১ জন অভিযুক্তের নাম রয়েছে, যার মধ্যে দুই জন স্থানীয় বিজেপি কর্মীও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সিবিআই সম্প্রতি রথের অফিসে কর্মরত বিজেপি কর্মী সাগর সোনকর এবং তার ভাই সাহেব সোনকরকে গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে, উত্তরপ্রদেশের পেশাদার শুটারদের মোটা অঙ্কের সুপারি বা চুক্তি দিয়ে চন্দ্রনাথ রথকে খুন করানোর মূল ষড়যন্ত্রে সরাসরি যুক্ত ছিল এরা।
হত্যার নেপথ্য পরিকল্পনা ও টাইমলাইন: তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভবানীপুর উপনির্বাচন বা অন্যান্য হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক লড়াইয়ে শুভেন্দু অধিকারীর প্রচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। সিবিআই জানতে পেরেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই রথকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কষছিল দুষ্কৃতীরা। তবে নানা কারণে এই ভাড়াটে হত্যাকাণ্ডের তারিখ ও ব্লু-প্রিন্ট বারবার বদলানো হয়।
অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ঠিক দুদিন পর, অর্থাৎ গত ৬ মে মধ্যগ্রামে দুষ্কৃতীদের নির্মম গুলিতে খুন হন চন্দ্রনাথ রথ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিশেষ অনুরোধে রাজ্য পুলিশের হাত থেকে এই হাই-প্রোফাইল চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই।
গ্রেপ্তারির জাল ও তদন্তের অগ্রগতি: সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত এই চাঞ্চল্যকর মামলায় মোট ৬ জন শুটার—মনু সিং, রাজ সিং, গোলু সিং, মায়াঙ্ক রাজ মিশ্র, ভিকি মৌর্য এবং নবীন কুমার সিং-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি ভাড়াটে খুনি বা সহযোগী হিসেবে বিনয় রায়, সঞ্জয় রায় ও বিকাশ মিশ্রকেও জালে এনেছেন তদন্তকারীরা। তবে এই মুহূর্তে মূল চক্রের একজন অভিযুক্ত এখনও পলাতক রয়েছে, যার খোঁজে তল্লাশি চলছে।
তদন্তে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ধৃত সাগর সোনকর ২০২০ সাল পর্যন্ত অন্য একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের এক বিধায়কের সঙ্গে কাজ করতেন। এর নেপথ্যে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের বড় কোনো নেতার বা কর্মকর্তার যোগ রয়েছে কি না, তাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।
কে ছিলেন চন্দ্রনাথ রথ? প্রাথমিক জীবনে চন্দ্রনাথ রথ ভারতীয় বিমান বাহিনীতে (IAF) অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পর তিনি কর্পোরেট সেক্টরে কিছুকাল কাজ করেন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমন্বয়কারী ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন। ২০১৯ সাল থেকেই তিনি শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন। মূলত সাংগঠনিক কাজ, লজিস্টিক বা রসদ ব্যবস্থাপনা এবং দলীয় কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের মূল দায়িত্ব সামলাতেন তিনি। দীর্ঘ দুই দশক ধরে অধিকারীর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকা চন্দ্রনাথের এমন আকস্মিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও শোরগোল সৃষ্টি হয়েছিল। এখন সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতে চার্জশিট জমা পড়ার পর এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।