মেটা কি আর ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা পাবে? ডিপফেক ও সিএসএএম রুখতে কেন্দ্র কঠোর আইনি পদক্ষেপের পথে

বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা (Meta)-র প্ল্যাটফর্মগুলিতে ডিপফেক (Deepfake), শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত আপত্তিকর সামগ্রী (CSAM) এবং লেবেলবিহীন এআই-নির্মিত কন্টেন্টের লাগামছাড়া বাড়বাড়ন্ত রুখতে এবার এক নজিরবিহীন ও কঠোর অবস্থানের পথে হাঁটল কেন্দ্রীয় সরকার। মেটার গ্লোবাল টিমের সঙ্গে টানা কয়েকদিনের ম্যারাথন বৈঠকের পর এবার আইনি বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী বড় ও निर्णायक পদক্ষেপের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র। সরকারের মূল লক্ষ্য একটাই—সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের নিয়মকানুন যথাযথভাবে মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

মূল বিতর্ক ও আইনি প্রশ্ন: সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই গোটা প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন। তা হলো—কোনো প্ল্যাটফর্ম যদি তাদের নিজস্ব রিকমেন্ডেশন সিস্টেম বা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে ঠিক করে দেয় যে একজন ব্যবহারকারী ফিডে ঠিক কী দেখবে, কিংবা টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কন্টেন্টের প্রচার (Ad-promotion) চালায়, তবে তারা কি আইনগতভাবে কেবল নিরপেক্ষ ‘মধ্যস্থতাকারী’ (Intermediary) হিসেবে গণ্য হতে পারে? নাকি তাদের একজন ‘প্রকাশক’-এর (Publisher) মতো কন্টেন্টের সমস্ত দায়দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে?

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯ ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ বা যথাযথ সতর্কতা এবং শর্তাবলী কঠোরভাবে মেনে চললে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি তৃতীয় পক্ষের কন্টেন্টের আইনি দায় থেকে ‘সেফ হারবার’ (Safe Harbour) বা দায়মুক্তির সুরক্ষা পেয়ে থাকে। তবে বর্তমানে মোদি সরকার খতিয়ে দেখছে যে, মেটা বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলি যদি এই যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের শর্তগুলি লঙ্ঘন করে, তবে তাদের সেই আইনি সুরক্ষাকবচ বা দায়মুক্তি বাতিল করা যায় কি না।

মেটার সঙ্গে বৈঠক ও কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেসবুক পোস্ট সাময়িকভাবে উধাও হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে মেটার তরফে সেটিকে ‘কারিগরি ত্রুটি’ বলে স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশের ঘটনার পরেই এই উচ্চপর্যায় বৈঠকগুলির সূত্রপাত হয়। মেটার প্রতিনিধি দল তাদের বর্তমান কন্টেন্ট ফিল্টারিং ব্যবস্থার ত্রুটি স্বীকার করলেও কেন্দ্র কোনো অজুহাত শুনতে নারাজ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী—

  • মেটার সঙ্গে অনুষ্ঠিত ম্যারাথন বৈঠকগুলির ফলাফল বর্তমানে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

  • এর পর আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত বা পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

  • শুধু মেটাই নয়, আগামী দিনে দেশের অন্যান্য জনপ্রিয় অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকেও তলব করে তারা ভারতীয় আইনের মধ্যস্থতাকারীর সংজ্ঞা ও শর্ত সঠিকভাবে পূরণ করছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

  • এমনকি এই বিষয়ে আগামী সপ্তাহেও আরও একটি উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারি সূত্রের তরফ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এই পুরো কড়াকড়ির উদ্দেশ্য কোনোভাবেই বাকস্বাধীনতা রোধ করা বা ‘সেন্সরশিপ’ চাপানো নয়, বরং বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলি যাতে ভারতের আইনকানুনকে পুরোপুরি সম্মান জানিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা বজায় রাখে, সেটাই সুনিশ্চিত করা।

Samrat Das
  • Samrat Das

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *