MBBS পাশ করলেই কি গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা বাধ্যতামূলক? দেশজুড়ে এক নীতি চালুর পক্ষে জোরালো সওয়াল সুপ্রিম কোর্টের

এমবিবিএস (MBBS) বা উচ্চতর মেডিক্যাল ডিগ্রি অর্জনের পর চিকিৎসকদের কি বাধ্যতামূলকভাবে কিছু সময় গ্রামীণ এলাকায় পরিষেবা দিতে হবে? রাজ্যভেদে আলাদা আলাদা নিয়ম না রেখে, এই বিষয়ে গোটা দেশের জন্য একটি অভিন্ন নীতি তৈরির পক্ষে জোরালো মত প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার শীর্ষ আদালত কেন্দ্রকে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে।
‘নেশন বিল্ডিং’ বা দেশগঠনের দায়িত্ব
মামলার শুনানিতে বিচারপতি পিএস নরসিমহা এবং বিচারপতি অলোক আরাধের বেঞ্চ স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে যে, চিকিৎসার ছাত্রছাত্রীদের দেশ গঠন বা ‘নেশন বিল্ডিং’-এর প্রতিও বিশেষ দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই বাধ্যতামূলক গ্রামীণ পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজ্যগুলির খেয়ালখুশির বদলে একটি সর্বভারতীয় স্তরে অভিন্ন নীতি থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আদালতের এই বার্তার পর কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশ নিয়ে আদালতকে জানানোর কথা বলেছেন।
সুপ্রিম কোর্টে মামলার সূত্রপাত কেন?
এই গোটা আইনি বিতর্কের সূত্রপাত কর্নাটকের একটি বিশেষ নিয়মকে কেন্দ্র করে। কর্নাটকে নিয়ম রয়েছে যে, মেডিক্যাল পড়ুয়ারা তাঁদের স্থায়ী রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার আগে এক বছর বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি গ্রামীণ পরিষেবা দেবেন।
কর্নাটকের ওই আইন (Karnataka Compulsory Service Training by Candidates Completed Medical Courses Act, 2012) এবং পরবর্তী ২০১৫ সালের বিধি অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি কোটার আসনে পড়া এমবিবিএস, স্নাতকোত্তর (PG) এবং সুপার স্পেশালিটি পড়ুয়াদের এই এক বছর কাজ করতেই হয়। এই পরিষেবা শেষ করার পরই মেলে প্রয়োজনীয় নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) এবং কর্ণাটক মেডিক্যাল কাউন্সিলে স্থায়ী রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ।
বেসরকারি আসনের পড়ুয়াদের নিয়ে বিতর্ক
বিতর্ক আরও তীব্র রূপ নেয় ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই একটি বিজ্ঞপ্তি জারির পর। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বেসরকারি ও ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইভেট সিটে (private seat) ভর্তি পড়ুয়াদের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক গ্রামীণ পরিষেবার শর্ত প্রযোজ্য করা হয়।
এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই আদালতের দ্বারস্থ হন বেশ কয়েকজন পড়ুয়া। তাঁদের মূল যুক্তি ছিল— সরকারি আসনে পড়া ছাত্রছাত্রী এবং বিপুল অর্থ খরচ করে সম্পূর্ণ বেসরকারি আসনে পড়াশোনা করা মেডিক্যাল পড়ুয়াদের এক নিক্তিতে মাপা যায় না। সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের নিরিখেও দুই শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত পার্থক্য রয়েছে। তাই তাঁদের বাধ্যতামূলক গ্রামীণ পরিষেবার বন্ড বা হলফনামা ছাড়াই এনওসি এবং রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার আবেদন জানানো হয়।
চিকিৎসকদেরও দেশের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে: শীর্ষ আদালত
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি নরসিমহা বিষয়টিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর সাফ কথা ছিল, মেডিক্যাল শিক্ষার সঙ্গে কোনও না কোনও স্তরে রাষ্ট্রের সম্পদ ও পরিকাঠামোর যোগসূত্র রয়েছে। তাছাড়া চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞান নিজে থেকেই সমাজের জন্য একটি অমূল্য সম্পদ। ফলে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের বৃহত্তর জনস্বার্থে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসেও এই মামলার শুনানিতে আদালত প্রশ্ন তুলেছিল যে, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়াদের কেন গ্রামগঞ্জে কাজ করা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হবে?
কেন্দ্র পেল তিন সপ্তাহের সময়
শুক্রবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি দেশজুড়ে বাধ্যতামূলক গ্রামীণ পরিষেবার কোনও কঠোর নির্দেশ দেয়নি। তবে এমন একটি সর্বভারতীয় অভিন্ন নীতি তৈরির প্রয়োজনীয়তা কতটা, সে বিষয়ে কেন্দ্রকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে। সলিসিটর জেনারেল সরকারের কাছ থেকে নির্দেশ নেওয়ার জন্য সময় প্রার্থনা করলে আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে এবং আগামী তিন সপ্তাহ পরে মামলাটি তালিকার শীর্ষে রাখার নির্দেশ দেয়।
আগে থেকেই ঝুলে রয়েছে ‘এক দেশ, এক নীতি’র প্রসঙ্গ
চিকিৎসকদের বাধ্যতামূলক পরিষেবা নিয়ে শীর্ষ আদালতে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট (PG) এবং সুপার স্পেশ্যালিটি কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্যের বাধ্যতামূলক পরিষেবা বন্ড বা ‘কম্পালসরি সার্ভিস বন্ড’ নিয়ে এর আগেও মামলা হয়েছে। যদিও আদালত সেই ব্যবস্থা বাতিল করেনি, তবে বিভিন্ন রাজ্যে বন্ডের শর্তে আকাশ-পাতাল তফাত থাকায় একটি অভিন্ন নীতি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার উঠেছে।
সুপ্রিম কোর্টের শুক্রবারের এই পর্যবেক্ষণের জেরে আগামী দিনে এমবিবিএস থেকে শুরু করে পিজি বা সুপার স্পেশালিটি পাশ করা চিকিৎসকদের গ্রামীণ পরিষেবার নিয়মে বড়সড় রদবদল আসতে পারে। তবে এখনই রাতারাতি সারা দেশের সমস্ত মেডিক্যাল পড়ুয়ার জন্য গ্রামে এক বছর কাজ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে না—আপাতত আদালত একটি সর্বভারতীয় অভিন্ন নীতি তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে কেন্দ্রের মতামত জানতে চেয়েছে।