কেন তৃণমূল ছেড়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী? ৬ বছর পর সেই কারণ ফাঁস করলেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই

জন্মলগ্ন থেকেই যিনি ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ অনুগত সৈনিক— সেই নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ শুভেন্দু অধিকারী আজ দল বদল করে গেরুয়া শিবিরের কাণ্ডারী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভা নির্বাচনে দু-দুবার পরাজিত করার বিরল রেকর্ডও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। একসময়ের সেই দাপুটে নেতা — সম্প্রতি নবান্নে পুরনো সহকর্মীদের সামনে ফাঁস করলেন তাঁর দল ছাড়ার আসল ও চাঞ্চল্যকর কারণটি।
শুভেন্দু অধিকারীর তৃণমূল ত্যাগের সেই দিনগুলো
সালটা ২০২০। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষেই তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু। তার ঠিক আগের বছরই ছিল রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন। দল ছাড়ার আগে তিনি সামলেছিলেন রাজ্যের পরিবহন, সেচ ও জলসম্পদ দফতরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক। ৭ নভেম্বর মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করার পর ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে তিনি তৃণমূলের প্রাথমিক সদস্যপদ এবং সমস্ত দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দেন। এর আগে হুগলি নদী জলপথ সেতু কমিশনের (HRBC) চেয়ারম্যান পদসহ সমস্ত সরকারি দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ান তিনি। একসময়ে যুব তৃণমূলের দায়িত্ব সামলানো এবং একাধিক জেলার পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে থাকা এই নেতার গেরুয়া শিবিরে যোগদান রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল ভূকম্পন সৃষ্টি করেছিল।
নবান্নে দেড় ঘণ্টার আন্তরিক বৈঠক ও নস্টালজিক মুহূর্ত
সম্প্রতি নবান্নে একটি বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মোট ১৩ জন বিধায়ক। আর সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম এবং অরূপ রায়ের মতো একদা শুভেন্দুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও পুরনো পরিচিত মুখগুলিও। যদিও মূল আলোচ্য বিষয় ছিল এসআইআরের ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত জরুরি কিছু বিষয়, তবে বৈঠকের আবহ দ্রুত রূপ নেয় আন্তরিক আড্ডায়।
পুরনো সঙ্গীদের সামনাসামনি পেয়ে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন শুভেন্দু। প্রয়াত প্রবীণ নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, একসময়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঠিক কতটা খোলামেলা আলোচনা হত, তা ববিদা (ফিরহাদ হাকিম) বা অন্য পুরনো সঙ্গীরাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
দল ছাড়ার আসল কারণ ফাঁস করলেন শুভেন্দু
পুরনো সহকর্মীদের কাছে পেয়ে তৃণমূল ছাড়ার নেপথ্যে থাকা বহুচর্চিত কারণটি আরও একবার স্পষ্ট করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, ২০১১ সালের ২১ জুলাইয়ের একটি বিশেষ ঘটনার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৃণমূলে তাঁর পক্ষে আর থাকা সম্ভব নয়। শুভেন্দুর অভিযোগ, সেদিন প্রকাশ্য মঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় আচমকাই তাঁর হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে অন্য একজনকে দেওয়া হয়েছিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন দলের অন্দরে বাতাবরণ ঠিক কোন দিকে গড়াচ্ছে। পাশাপাশি দলে ‘ভাইপো রাজ’ শুরু হওয়ার প্রসঙ্গও তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে তোলেন।
ফিরহাদ হাকিমের মুখে শুভেন্দুর প্রশংসা ও জমকালো আপ্যায়ন
রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই থাকুক না কেন, এই বৈঠকের পর বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার ঘরে গিয়ে ফিরহাদ হাকিম বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মন্তব্য করেন, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর তিনি এমন আন্তরিক মুখ্যমন্ত্রী আর দেখেননি, বরং তাঁর কাজের তুলনা টানা চলে কেবল প্রয়াত বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গেই।
অন্যদিকে, নবান্নে আগত এই বিধায়কদের অতিথ্য আপ্যায়নেও কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি। সূত্রের খবর অনুযায়ী, মেনুতে ফিশরোল, চিকেন স্প্রিং রোল, কালাকাঁদ, মিষ্টিসুখ ও কুকিজের পাশাপাশি রাখা হয়েছিল চা ও ব্ল্যাক কফির সুব্যবস্থাও।