বিজেপি জোটে ‘না’, অমিত শাহের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক! মুর্শিদাবাদের ৩ সাংসদের পদক্ষেপে ওলটপালট বাংলার সমীকরণ?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই রাজ্যের রাজনীতিতে একের পর এক নাটকীয় পটপরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবার মুর্শিদাবাদ জেলার তিন হেভিওয়েট সাংসদ—জঙ্গিপুরের খলিলুর রহমান, বহরমপুরের ইউসূফ পাঠান এবং মুর্শিদাবাদের আবু তাহের খানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে তীব্র জল্পনার সৃষ্টি করেছে। অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে এনসিপিআই (NCPI)-তে যোগ দেওয়া এই তিন সাংসদ বর্তমানে শাসকদল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

এনডিএ জোট থেকে দূরত্ব ও কৌশলগত অবস্থান

জানা গিয়েছে, নয়াদিল্লিতে এনডিএ-র উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় বৈঠকগুলি থেকে সচেতনভাবেই দূরে থাকছেন এই তিন সাংসদ। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁরা কেবল একান্ত আবশ্যক প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমেই যোগাযোগ রাখছেন। এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখে কুলুপ এঁটেছেন তিনজনই।

তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে এই তিন সাংসদের সাক্ষাৎ নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা তুঙ্গে ওঠে। জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান স্পষ্টতই জানিয়েছেন, “আমাদের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দুটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছিল। অন্য কোনো বিষয়ে আমরা মন্তব্য করব না।” জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার অপসারণ সংক্রান্ত একটি বিশেষ বিষয় এবং নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন ও ভোটার তালিকা সংস্কারের মতো বিষয়গুলি নিয়েই মূলত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, আদর্শগত সমালোচনা বা রাজনৈতিক আপসকামিতার অভিযোগ থেকে নিজেদের বাঁচাতেই তাঁরা জোটের রাজনীতির চেয়ে ‘বিষয়ভিত্তিক আলোচনা’ বা ইস্যুভিত্তিক রাজনীতিকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

মুর্শিদাবাদের বিশেষ জনবিন্যাসই কি এর আসল কারণ?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন সাংসদের এই কৌশলী অবস্থানের পিছনে রয়েছে মুর্শিদাবাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল জনবিন্যাস (Demographics)। যেহেতু তাঁরা তিনজনই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা থেকে লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাই সরাসরি বা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপি-সমর্থিত এনডিএ জোটে নাম লেখালে তাঁদের প্রথাগত ভোটারদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। নিজের ঘাঁটিতে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এখন তাঁদের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

পাশাপাশি, এই তিন সাংসদের এই ভিন্ন অবস্থানের ফলে ২০ সদস্যবিশিষ্ট এনসিপিআই দলটির অন্দরেও মতপার্থ ও বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলায় নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় থাকা বিজেপির ক্ষেত্রেও এই স্থানীয় সাংসদদের দলীয় গণ্ডির বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থ দেখার প্রবণতা নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। আগামী দিনে মুর্শিদাবাদের এই তিনটি লোকসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি যে বাংলার রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *