অসমে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে বন্যা! ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ জনের মৃত্যু, চলতি মরসুমে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫

ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য অসমে বন্যা পরিস্থিতি (Assam Flood) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও মারাত্মক ও আশঙ্কাজনক দিকে এগোচ্ছে। বুধবারের সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যে বন্যার কারণে আরও ৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বর্ষা মরসুমে রাজ্যজুড়ে বন্যায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ জনে (Assam flood death toll)। বিভিন্ন নদীর জলস্তর হু হু করে বিপদসীমার ওপর দিয়ে চলায় রাজ্যের ১৪টি জেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘হাই অ্যালার্ট’ (Assam Flood Crisis high alert) জারি করা হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টার হতাহতের চিত্র ও ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলি
‘ডিজাস্টার রিপোর্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (DRIMS)-এর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অসমের একাধিক জেলার গ্রামীণ এবং শহরাঞ্চল এখনও জলের নিচে ডুবিয়ে রয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ৬ জনের মধ্যে ৫ জনই গ্রামীণ অঞ্চলের বন্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে বিশ্বনাথ ও শিবসাগরে দুজন করে এবং গোলাঘাটে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এছাড়া মরিগাঁও জেলার মায়ং রাজস্ব সার্কেলের শহরাঞ্চলের জমা জলে (Urban Flooding) ডুবে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। ওদালগুড়ি জেলা থেকে এক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার খবরও মিলেছে।

নুমালীগড়ের ধানসিঁড়ি (দক্ষিণ) নদীর জলস্তর এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। নদীর এই জলস্ফীতির কারণে রাজ্যের যে ১৪টি জেলায় ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে, সেগুলি হল— গোলাঘাট, লখিমপুর, চরাইদেও, শিবসাগর, বিশ্বনাথ, ধেমাজি, কামরূপ (মেট্রোপলিটন), জোরহাট, শোণিতপুর, তিনসুকিয়া, নগাঁও, দরাং, কার্বি আংলং এবং ওদালগুড়ি।

এই সর্বগ্রাসী বন্যার জেরে প্রায় ৫৬৩টি গ্রামের ১ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। গোটা রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা শিবসাগর জেলার, যেখানে প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ জলবন্দি। এর পরেই রয়েছে গোলাঘাট ও জোরহাট জেলা।

বাঁধ ও সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, ব্যাপক ক্ষতি কৃষিক্ষেত্রে
বন্যার তোড়ে অসমের পরিকাঠামোগত যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। রাজ্যজুড়ে অন্তত ৭টি বড় বাঁধ ও নদীর পাড় ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে:

বিশ্বনাথ জেলার ব্রহ্মজানে ৫টি এবং দরাং জেলার মঙ্গালদৈতে ২টি নদীর পাড় ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

চরাইদেওর চোলা পথারে একটি স্টিলের সেতু এবং ওদালগুড়ির টাংলায় একটি পায়ে হাঁটার পদসেতু (Footbridge) ভেঙে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্র ও পশুপালনেও নেমে এসেছে বড় বিপর্যয়। রাজ্যের ১৬,৯৫১ হেক্টর চাষের জমি সম্পূর্ণ জলের নিচে তলিয়ে গেছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে— প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি গবাদি পশু বন্যাকবলিত এবং প্রায় ৮,৫০০ প্রাণী (যার সিংহভাগই শিবসাগর জেলার) জলের তোড়ে ভেসে গেছে।

গুয়াহাটিতে জলযন্ত্রণা ও ত্রাণ তৎপরতা
গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি রাজধানী গুয়াহাটি সহ কামরূপ, কামরূপ (মেট্রোপলিটন), মরিগাঁও এবং জোরহাটের বিভিন্ন শহরাঞ্চলেও কৃত্রিম বন্যার প্রকোপ বেড়েছে। কামরূপ (মেট্রোপলিটন)-এর সাতগাঁও এবং হাতীগাঁওয়ের মতো জলমগ্ন এলাকা থেকে নৌকা নামিয়ে প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করেছে এসডিআরএফ (SDRF) ও ডিডিআরএফ (DDRF)। গুয়াহাটির অনিল নগর ও জুরি পারের মতো নিচু এলাকাগুলিতে জল জমে জনজীবন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য সরকারের তরফে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ৪৫টি ত্রাণ শিবিরে ১২,৩৫৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়াও ৫৯টি ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারের মাধ্যমে ৩২ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে চাল, ডাল, নুন এবং গবাদি পশুর খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে।

তবে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নদীগুলির উৎসস্থল বা ক্যাচমেন্ট এলাকাগুলিতে আগামী দিনেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদীগুলির জলস্তর আরও বৃদ্ধি পেয়ে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রশাসন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *