‘বিশ্ব কেন এত অশান্ত?’ কারণ ব্যাখ্যা করে বিশ্বের সামনে ভারতের কোন সুমহান ঐতিহ্য তুলে ধরলেন মোহন ভাগবত?

সর্বভারতীয় বিহার সেবা সমূহের চতুর্দশ বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে বিশ্বশান্তি এবং ভারতের প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্য নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর বার্তা দিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস (RSS) প্রধান মোহন ভাগবত। শুক্রবার মুম্বইয়ে আয়োজিত এই বিশেষ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আধুনিক বিশ্বের অশান্তি ও সংঘাতের মূল কারণ ব্যাখ্যা করেন। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে এই কথা তুলে ধরেন যে, বর্তমান বিশ্বজুড়ে মানবজাতি যে সমস্ত জটিল চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তার একমাত্র সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে রয়েছে ভারতের সুমহান ও বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের মধ্যেই।
বিশ্ব কেন আজ অশান্ত? কী ব্যাখ্যা দিলেন আরএসএস প্রধান?
সম্মেলনে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন যে, জাগতিক মোহের দুনিয়ায় প্রতিটি আনন্দই কোনো না কোনোভাবে অপূর্ণ থেকে যায়। মানুষের প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছার সঙ্গেই অন্তনির্হিত থাকে কোনো না কোনো ধরনের ক্ষতি বা বেদনার আশঙ্কা। মানুষের একেকটি আনুগত্য অন্য কোনো না কোনো আনুগত্যের সঙ্গে তীব্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে মানুষের চিন্তাধারায় একটা চরমপন্থা বা উগ্রতা কাজ করছে, যেখানে কোনো ভারসাম্য বা মধ্যপন্থা খুঁজে পাওয়া যায় না— আর ঠিক এই কারণেই গোটা বিশ্ব আজ চরম অশান্ত ও অস্থির হয়ে উঠেছে।
তবে এর পাশাপাশি আশার আলো দেখিয়ে আরএসএস প্রধান স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, বিশ্ব আজ খুব ভালো করেই জানে মানবকল্যাণ ও অগ্রগতির প্রকৃত পথ শুধুমাত্র ভারতেই নিহিত রয়েছে। বিগত প্রায় তিন হাজার বছরেরও বেশি দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে, ভারত কখনোই কোনো স্বাধীন দেশ জয় করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়নি, জোর করে কাউকে কোনো ধর্মে ধর্মান্তরিত করেনি এবং অন্য দেশের ওপর চড়াও হয়নি। বরং ভারত সর্বদা বিশ্ববাসীকে নিঃস্বার্থভাবে সুখ, শান্তি ও অহিংসার পথ দেখিয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই আজ গোটা বিশ্বের নজর ও বিরাট প্রত্যাশা ভারতের দিকেই রয়েছে।
ধর্ম ও রাষ্ট্র অবিচ্ছেদ্য: মুম্বইয়ের সম্মেলনে মোহন ভাগবত
মুম্বইয়ের এই সর্বভারতীয় সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় পিটিআই (PTI)-এর সূত্রে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় মোহন ভাগবত আরও জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, ভারতে ‘ধর্ম’ এবং ‘রাষ্ট্র’ সর্বদা একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। বিশ্বের সমসাময়িক সংকটগুলি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে দেশের প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে।
এদিন তিনি ভারতের সমৃদ্ধ ও বহুমুখী জ্ঞান-ভাণ্ডারের কথা স্মরণ করান, যার মধ্যে বেদ, উপনিষদ, মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত, পবিত্র গীতা, জৈন আগম, বৌদ্ধধর্মের ত্রিপিটক, শিখ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহেব এবং দেশের প্রাতঃস্মরণীয় সাধু-সন্তদের অমূল্য শিক্ষাগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভাগবত বলেন, আমাদের এই পবিত্র ভূমিতে জ্ঞানের যে অপার সাগর রয়েছে, তা আজকের অশান্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। ভক্তি ও সাধনার শক্তির মাধ্যমেই একমাত্র ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করা সম্ভব। যাঁরা যুগ যুগ ধরে এই দিব্য জ্ঞান মানবসমাজে বিতরণ করে গিয়েছেন, তাঁদের জীবনদর্শন এবং সুমহান ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা কেবল কোনো ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়, এটি সরাসরি সমগ্র মানবতার প্রতি এক মহৎ সেবামূলক কাজ।
বহু জন্মের প্রায়শ্চিত্ত ও মহৎ লক্ষ্যের মাহাত্ম্য
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জীবনের পরম প্রাপ্তি ও ভাগ্যের কথা বলতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, মানুষের মনে নিষ্ঠা যদি কোনো মহৎ, দিব্য এবং পবিত্র লক্ষ্যের প্রতি নিবেদিত থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের তুচ্ছ জীবনকেও স্বর্গীয় সুখে রূপান্তরিত করে তুলতে পারে। এমন একটি উচ্চ উদ্দেশ্যে নিজের জীবনকে পুরোপুরি উৎসর্গ করার সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত ভাগ্যের ব্যাপার। অন্যথায়, জীবনে এমন অর্থবহ ও মহান কাজ সম্পন্ন করার জন্য বহু জন্মের কঠোর তপস্যা বা সাধনার প্রয়োজন হয়। হয়তো আপনারা আপনাদের পূর্বজন্মে ঠিক এই ধরনের পুণ্যকর্মই সম্পন্ন করে এসেছিলেন, যার ফলেই আজ এই মহান সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।