“জল খেলেও খাবার স্পর্শ নয়”-অনশনে অনড় ঝাড়খণ্ডের ‘ওয়াংচুক’, জানুন কী কী দাবি?

রাঁচি: বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রশ্নফাঁসের মহড়া, দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ, একের পর এক পরীক্ষা বাতিল এবং তারপর আবার নতুন করে শূন্য থেকে শুরু—এই অন্তহীন চক্রব্যূহে আটকে গিয়েছে দেশের একটি গোটা প্রজন্ম। দীর্ঘ এই যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে এবার নিয়োগ ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিতে রাঁচিতে শুরু হয়েছে তীব্র আন্দোলন। দিল্লির যন্তর মন্তরের পর এবার ঝাড়খণ্ডে আছড়ে পড়েছে সেই প্রতিবাদের ঢেউ। নিয়োগ প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার চেয়ে বর্তমানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসেছেন বিশিষ্ট ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো।

দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনে পরিবেশবিদ তথা শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের দেখানো পথ অনুসরণ করেই সরকারের কাছে কড়া জবাবদিহি চেয়ে এই অনশন শুরু করেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই তরুণ নেতা। গত ৩ জুলাই থেকে লাগাতার অনশনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। অবশেষে সোনম ওয়াংচুকের সরাসরি অনুরোধে সাড়া দিয়ে বুধবার সামান্য জল গ্রহণ করেন তিনি। তবে জল খেলেও দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মুখে এক দানাও তুলবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এই আন্দোলনকারী।

সূত্রের খবর, ভিডিও কলে প্রায় ১০ মিনিট ধরে দেবেন্দ্রর সঙ্গে কথা বলেন সোনম ওয়াংচুক। আন্দোলনকারীর স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁকে জলটুকু খাওয়ার অনুরোধ জানান সোনম। সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে দেবেন্দ্র বলেন, “আমার শরীর বেশ কিছুদিন ধরেই ভালো যাচ্ছিল না। তবে সোনম ওয়াংচুকজির অনুরোধেই আমি জল খেয়েছি। যন্তর মন্তরে যেভাবে তিনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ঝাড়খণ্ডের এই লড়াইতেও আমরা তাঁর উপস্থিতি ও সাহায্য কামনা করছি।”

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও মূল দাবি

এর আগে ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের পর ময়দানে নামে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। গোটা ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি ওঠে। দীর্ঘ লড়াই এবং সোনম ওয়াংচুকের অনশনের সেই আন্দোলনের কাছে একপ্রকার নতিস্বীকার করে কেন্দ্রীয় সরকার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ঠিক সেই ফর্মুলাকেই সামনে রেখে এবার ঝাড়খণ্ডেও আন্দোলন তীব্রতর করেছেন ছাত্রছাত্রীরা।

মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত—ঝাড়খণ্ডের বহু অভাবী ও মেধাবী পড়ুয়া এই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। একটা বড় অংশের ছাত্রছাত্রী হয় পরীক্ষার ফলাফলের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছেন, নয়তো অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে ফের প্রস্তুতি শুরু করবেন কি না তা নিয়ে ধন্দ্বে রয়েছেন। জীবন যেন এক অনন্ত ‘লুপ’-এ আটকে গেছে, যেখানে পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন আর চাকরি দুটোই অধরা। আন্দোলনকারীদের মুখে বারবার উঠে এসেছে ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (JSSC) CGL পরীক্ষার চরম অব্যবস্থার প্রসঙ্গ।

আন্দোলনকারীদের প্রধান তিনটি দাবি হলো:

  • প্রথমত: টিডিপিএল (TDPL) পরিচালিত সমস্ত পরীক্ষাই অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

  • দ্বিতীয়ত: বিতর্কিত অভিযুক্ত অভয় তিওয়ারির সঙ্গে যুক্ত সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

  • তৃতীয়ত: নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়া, পাকা পরীক্ষার ক্যালেন্ডার প্রকাশ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং নিয়মিত কাট-অফ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

ছাত্রনেতা ও পরীক্ষার্থীদের এই ব্যাপক অসন্তোষ প্রসঙ্গে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন জানিয়েছেন, “চাকরিপ্রার্থীদের সমস্ত দাবিদাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যথাযথ সময়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

তবে শুধু আশ্বাসে চিড়ে ভিজবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান আন্দোলনকারীরা। দশকের পর দশক ধরে চলা এই নিয়োগ দুর্নীতির জাল ছিন্ন করতে ঝাড়খণ্ডের জেন-জি প্রজন্ম এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *