আসল পনির ভেবে খাচ্ছেন ভেজিটেবল অয়েল আর স্টার্চ? অ্যানালগ পনিরের রমরমা রুখতে কড়া পদক্ষেপ প্রশাসনের

আপনার থালায় পরিবেশন করা নরম, ধবধবে সাদা পনিরের টুকরোটি সত্যিই কি খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি? নাকি সেটি কেবল ভেজিটেবল অয়েল আর স্টার্চ দিয়ে বানানো পনিরের এক কৃত্রিম রূপ? বিয়েবাড়ি, সস্তা রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন খাবারের দোকানে দীর্ঘদিন ধরেই আসল পনিরের জায়গায় চুপিসারে স্থান করে নিচ্ছে এই কম খরচের বিকল্প—যার নাম ‘অ্যানালগ পনির’ (Analogue Paneer)।

জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে এই জালিয়াত পণ্যের ওপর এবার চরম কড়াকড়ি শুরু করেছে প্রশাসন। ছত্তীসগড়ের পর দেশের দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে মহারাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) রাজ্যে অ্যানালগ পনিরের উৎপাদন, মজুত, পরিবহন ও বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে। এই নিয়ম ভাঙলে ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি এই অনিরাপদ খাবার খেয়ে কারও মৃত্যু হলে, অপরাধের গুরুত্ব বুঝে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে!

আসল পনির বনাম অ্যানালগ পনির: তফাৎ কোথায়?
আসল পনির: খাঁটি দুধে থাকা ‘কেসিন’ (Casein) নামক প্রোটিন অ্যাসিডের (লেবুর রস বা ভিনিগার) সংস্পর্শে এসে জমাট বাঁধে। প্রোটিনের সেই নরম জালের মধ্যে দুধের ফ্যাট ও জল আটকে তৈরি হয় আসল ছানা বা পনির।

অ্যানালগ পনির: অ্যানালগ পনিরে দুধের দামি ফ্যাটের বদলে ব্যবহার করা হয় অত্যন্ত সস্তা পাম অয়েল (Palm Oil) বা অন্যান্য ভেজিটেবল অয়েল। দুধের প্রোটিন হয় কমিয়ে দেওয়া হয় কিংবা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়। আর পনিরের মতো কৃত্রিম জমাট ভাব আনতে বাইরে থেকে মেশানো হয় স্টার্চ (Starch) ও নানা রাসায়নিক পদার্থ।

এফএসএসআই (FSSAI)-এর নিয়ম অনুযায়ী প্যাকেটের গায়ে স্পষ্ট করে লেখা থাকলে এটি বেআইনি নয়, কিন্তু ক্রেতাদের বোকা বানিয়ে আসল পনির বলে এই কৃত্রিম জিনিস বিক্রি করাই মূল অপরাধ ও প্রতারণা।

আসল ও নকল পনির চেনার সহজ উপায়
১. ল্যাবরেটরি টেস্ট: অ্যানালগ পনিরে থাকা উদ্ভিজ্জ তেলের কারণে এতে ‘বিটা-সিটোস্টেরল’ (Beta-sitosterol) নামক একটি যৌগ থাকে, যা খাঁটি দুধের ফ্যাটে কখনই থাকে না। ল্যাবরেটরিতে গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি পরীক্ষার মাধ্যমে এটি সহজে ধরে ফেলা যায়।
২. রান্নার সময় পরীক্ষা: খাঁটি পনির কড়াইতে ভাজার সময়ে নিজের সঠিক আকার ও গঠন ধরে রাখে এবং হালকা বাদামি রং নেয়। অন্যদিকে, অ্যানালগ পনির ভাজতে গেলেই অতিরিক্ত নরম হয়ে যায়, গলে যায় কিংবা কড়াইতে প্রচুর পরিমাণে তেল ছেড়ে দেয়।

স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ঝুঁকি কতখানি?
অ্যানালগ পনিরে সরাসরি বিষাক্ত উপাদান না থাকলেও এর পুষ্টিগুণ আসল পনিরের ধারেকাছেও আসে না। খাঁটি পনির থেকে আমরা যে উচ্চমানের প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন পাই, স্টার্চ ও সস্তা উদ্ভিজ্জ তেলে বানানো পনিরে তার ছিটেফোঁটাও থাকে না। উপরন্তু, অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিম্নমানের তেল দিয়ে এই পনির তৈরি করা হলে হৃদরোগ, কোলেস্টেরলসহ নানাবিধ শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

তাই কম খরচে পেট ভরানোর লোভ সামলে এবং ক্রেতা হিসেবে আসল পুষ্টি পাওয়ার অধিকার রক্ষা করতেই মহারাষ্ট্র সরকার এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *