‘বিয়ের ছবি থাকা মানেই বর-বউ প্রমাণ হয় না!’ দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগে চাকরি হারানো RPF কর্মীকে পুনর্বহালের নির্দেশ হাইকোর্টের

কোনও সাক্ষী ছাড়া শুধুমাত্র কিছু ছবি বা অসম্পূর্ণ নথি দেখিয়ে কোনও যুগলকে স্বামী-স্ত্রী বলে প্রমাণ করা যায় না এবং আইনগতভাবে এই ধরনের প্রমাণ কখনোই যথেষ্ট হতে পারে না। দ্বিতীয় বিয়ের দায়ে চাকরি হারানো এক রেল সুরক্ষা বাহিনী বা আরপিএফ (RPF) কর্মীর বরখাস্তের মামলায় এমনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। একইসঙ্গে রেলের সিদ্ধান্ত খারিজ করে ওই কর্মীকে পুনরায় চাকরিতে বহাল করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

ঠিক কী ছিল পুরো মামলাটি?
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২০ সালে ওই রেলকর্মীর প্রথম স্ত্রী রেল কর্তৃপক্ষের কাছে স্বামীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিয়ের গুরুতর অভিযোগ দায়ের করেন, যদিও তাঁদের মধ্যে আইনিভাবে কোনও বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হওয়ার পর ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে অভিযুক্ত কর্মীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয় এবং পরবর্তীতে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।

তদন্তকারী অফিসার অভিযোগের সত্যতা রয়েছে বলে রিপোর্ট দেওয়ায় ওই কর্মীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এর পরেই রেলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ওই কর্মী। মামলাকারীর মূল যুক্তি ছিল, শুধুমাত্র মুখে অভিযোগ তুললেই হয় না, দ্বিতীয় বিয়ের সপক্ষে শক্ত ও আইনি প্রমাণ দাখিল করতে হয়। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ কোনো সঠিক প্রমাণ যাচাই না করেই তাঁকে একতরফাভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে।

অন্যদিকে রেলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্তের প্রথম স্ত্রী হাজির ছিলেন এবং তিনি দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ সমর্থন করেছেন। এছাড়া ‘মৌনীবাবা মঠ’-এর একটি রেজিস্টারে দ্বিতীয় বিয়ের নথি এবং একটি বিয়ের ছবিও কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। সেই সমস্ত প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্তকারী অফিসার বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ
মামলার দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি প্রসেনজিৎ বিশ্বাস ও বিচারপতি মধুরেশ প্রসাদের ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত কড়া পর্যবেক্ষণ দিয়েছে:

সাক্ষী ও প্রমাণের অভাব: আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, এখানে অভিযুক্তের প্রথম স্ত্রী নিজেই মূল অভিযোগকারী, ফলে শুধু তাঁর একপক্ষের বক্তব্যকে ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। দ্বিতীয় বিয়ের আইনি প্রমাণ স্বরূপ ‘স্বাধীন’ ও ‘নির্ভরযোগ্য’ প্রমাণের প্রয়োজন হয়।

বিয়ের ছবির গ্রহণযোগ্যতা: আদালত জানায়, এক্ষেত্রে জমা দেওয়া বিয়ের ছবিও যথেষ্ট নয়। প্রথমে ছবিটির সত্যতা স্পষ্ট হতে হবে, ছবিতে কারা কারা আছেন তা জানতে হবে এবং সর্বোপরি আদৌ কোনো বৈধ বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা প্রমাণ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ছবিটির সমর্থনে কোনো ফটোগ্রাফারকেও সাক্ষী হিসেবে ডাকা হয়নি। ফলে দ্বিতীয় বিয়ের সপক্ষে কোনো আইনি ভিত্তি মেলেনি।

মঠের রেজিস্টারের নথির ত্রুটি: আদালত আরও জানায়, রেলের তরফ থেকে মঠে রেজিস্ট্রির যে ফটোকপি জমা দেওয়া হয়েছে, তাতে বর-কনে কিংবা কোনো স্বাধীন সাক্ষীরই কোনো স্বাক্ষর নেই। ফলে সেই অসম্পূর্ণ নথিকেও কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য আইনি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

বড় স্বস্তি পেলেন RPF কর্মী
উপরে সমস্ত দিক বিচার করে রেল কর্তৃপক্ষের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, ওই আরপিএফ কর্মীকে দ্রুত চাকরির পুনর্বহাল করতে হবে এবং এর জন্য চার সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বিগত পাঁচ বছরের অনুপস্থিতির সময়ের কথা মাথায় রেখে তাঁকে ‘নোশনাল সার্ভিস বেনিফিট’ বা কাল্পনিক চাকরির সুযোগ সুবিধা দিতে হবে বলেও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *