প্রায় দুই দশক পর বাংলায় প্রত্যাবর্তন তসলিমা নাসরিনের! দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে পা রাখলেন কলকাতায়

১৯৯৪ সালে জন্মভূমি বাংলাদেশ ত্যাগ এবং পরবর্তীতে ২০০৭ সালে চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জেরে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বিশিষ্ট ও বিতর্কিত সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর অবশেষে ‘মুক্ত’ বাংলায় পা রাখলেন তিনি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই শহরজুড়ে হোর্ডিংয়ে ছেয়ে গেছে এবং নতুন করে রাজনৈতিক ও সাহিত্য মহলে শুরু হয়েছে তীব্র চর্চা।

রবীন্দ্রসদনের বিশেষ অনুষ্ঠান ও শহরজুড়ে হোর্ডিং
আজ, ১ অগস্ট রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদ বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন ‘নির্বাসিত’ লেখিকা তসলিমা নাসরিন। প্রায় দুই দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে জীবন কাটাতে হলেও, তাঁর এই সাম্প্রতিক আগমনকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।

তসলিমা নাসরিনের বঙ্গে প্রত্যাবর্তন ও অতীতের বিতর্ক
জন্ম ও পরিচিতি: ১৯৬২ সালের ২৫ অগাস্ট বাংলাদেশের ময়মনসিংহে জন্ম তসলিমা নাসরিনের। পেশায় চিকিৎসক হলেও তাঁর লেখালেখি এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে চাঁচাছোলা সমালোচনাই তাঁকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া পরিচিতি।

‘লজ্জা’ উপন্যাস ও বাংলাদেশ ত্যাগ: ১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরের পটভূমিতে তিনি লেখেন তাঁর সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘লজ্জা’। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলেও বাংলাদেশে বইটি নিষিদ্ধ হয়। ধর্মীয় মৌলবাদীদের চরম আক্রোশ ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে ১৯৯৪ সালে বাধ্য হয়ে জন্মভূমি ছাড়েন তিনি।

কলকাতায় আগমন ও দেশত্যাগ (২০০৭): ইউরোপ-আমেরিকায় দীর্ঘ সময় কাটানোর পর ২০০৪ সালে ভারত সরকারের অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি নিয়ে কলকাতায় এসে থাকা শুরু করেন তসলিমা। কিন্তু ২০০৩ সালে তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্বিখণ্ডিত’ (যা বাংলাদেশে ‘ক’ নামে পরিচিত ছিল) প্রকাশের পরই উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা। ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও সমাজব্যবস্থার সমালোচনার জেরে সংখ্যালঘু এলাকায় তীব্র অশান্তি ছড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে এবং ২০০৭ সালে তসলিমাকে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করে।

তসলিমা নাসরিনের নিষিদ্ধ ৬টি বিতর্কিত বই
লেখিকার কলাম ও সাহিত্যিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে যে বইগুলি তীব্র বিতর্কের মুখে পড়ে নিষিদ্ধ হয়েছে:

১৯৯৩ – ‘লজ্জা’: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট ও উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে বাংলাদেশে বাজেয়াপ্ত।

১৯৯৯ – ‘আমার মেয়েবেলা’: পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার খোলামেলা বর্ণনায় ‘অশ্লীলতার’ অভিযোগে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।

২০০২ – ‘উতল হাওয়া’: ‘আমার মেয়েবেলা’র দ্বিতীয় খণ্ড; ইসলামবিরোধী তথ্যের অভিযোগে নিষিদ্ধ।

২০০৩ – ‘ক’: ব্যক্তিজীবনের খোলামেলা আলোচনা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নিয়ে মন্তব্যের জেরে নিষিদ্ধ।

২০০৩ – ‘দ্বি-খণ্ডিত’: ‘ক’-এর পশ্চিমবঙ্গ সংস্করণ; ধর্মীয় সম্প্রীতি ভঙ্গের অভিযোগে বামফ্রন্ট সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ।

২০০৪ – ‘সেই সব অন্ধকার’: ধর্মীয় বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।

অবশেষে দীর্ঘ ২০ বছর দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইনি টানাপোড়েনের পর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর এই বঙ্গে প্রত্যাবর্তন রাজ্য রাজনীতিতে একটি অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *