এবার জুতোর ফিতে বাঁধা থেকে জল দেওয়া—সব করবে অত্যাধুনিক হিউম্যানয়েড! তাক লাগাল গুগল!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির দুনিয়ায় ফের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁল গুগল ডিপমাইন্ড (Google DeepMind)। রোবট নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক কাজের পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন মেশিনের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের জন্য সংস্থাটি বাজারে নিয়ে এসেছে তাদের একেবারে নতুন এআই মডেলের সিরিজ—’জেমিনি রোবটিক্স ২’ (Gemini Robotics 2)। এই নতুন সিস্টেমটি রোবটের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে শুধুমাত্র টেবিলভিত্তিক সাধারণ কাজের গণ্ডি থেকে বের করে হাঁটা, ঝোঁকা, ভারসাম্য রক্ষা করা এবং নিখুঁতভাবে বিভিন্ন বস্তু পরিচালনা করার মতো সম্পূর্ণ শারীরিক গতিবিধির স্তরে উন্নীত করেছে।

অ্যাপট্রনিকের ‘অ্যাপোলো ২’ (Apollo 2) সহ বিভিন্ন হিউম্যানয়েড ও দুই-হাতের রোবটের ওপর এই প্রযুক্তির সফল প্রদর্শন করেছে গুগল। উদাহরণস্বরূপ, একটি হিউম্যানয়েড রোবটকে নির্দেশ দেওয়া হলে সে হেঁটে টেবিলের কাছে যায়, সেখান থেকে একটি জলের ক্যান তুলে স্টোরেজ ইউনিটের একদম নিচের তাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে রেখে দেয়। তবে গুগল স্বীকার করেছে যে রোবটের চলাচলের গতি বা মুভমেন্ট স্পিড আরও উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে। যার অর্থ এই মুহূর্তে এই রোবটগুলি এক লাফে প্রতিটি বাড়ি বা কারখানার অন্দরে নেমে পড়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পনা ও স্থানীয় কাজের জন্য রয়েছে তিনটি বিশেষ মডেল:
জেমিনি রোবটিক্স ২ পরিবার মূলত তিনটি প্রধান মডেলে বিভক্ত—
১. জেমিনি রোবটিক্স ২: এটি একটি ভিশন-ল্যাঙ্গুয়েজ-অ্যাকশন মডেল। এটি ক্যামেরার ইনপুট এবং মুখের কথা বা লিখিত নির্দেশকে নিখুঁত শারীরিক গতিবিধিতে রূপান্তর করতে পারে। এটি পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে হাতের আঙুল পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ হিউম্যানয়েডকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং দুই-হাতের রোবট পরিচালনা করতে সক্ষম।
২. জেমিনি রোবটিক্স ইআর ২ (Gemini Robotics ER 2): এটি রোবটের হাই-লেভেল বা উচ্চপর্যায়ের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করে। গুগলের দাবি অনুযায়ী, এটি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে, ঘরের ভেতরটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে পারে, পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করতে পারে এবং কাজটি সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তা ক্রমাগত নজরদারি করতে পারে।
৩. জেমিনি রোবটিক্স অন-ডিভাইস ২ (Gemini Robotics On-Device 2): এটি সরাসরি রোবটের নিজস্ব হার্ডওয়্যারে স্থানীয়ভাবে কাজ করে। মাত্র ২০০টির কম উদাহরণ এবং কয়েক ঘণ্টার ট্রেনিং ডেটা ব্যবহার করেই এটিকে যেকোনো নতুন দুই-হাতের রোবটের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
বর্তমানে জেমিনি রোবটিক্স ইআর ২ মডেলটি জেমিনি এপিআই (Gemini API) এবং গুগল এআই স্টুডিওর মাধ্যমে উপলব্ধ রয়েছে। এছাড়া জেমিনি এন্টারপ্রাইজ এজেন্ট প্ল্যাটফর্মে এটি প্রাইভেট প্রিভিউ পর্যায়ে রয়েছে। তবে মুভমেন্ট ও অন-ডিভাইস মডেলগুলি আপাতত শুধুমাত্র আর্লি-অ্যাক্সেস পার্টনারদের জন্যই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

সূক্ষ্ম কাজের জন্য রোবটের হাত:
গুগল জানিয়েছে যে, জেমিনি রোবটিক্স ২ মডেলটি অ্যাপোলো ২ রোবটের সঙ্গে ব্যবহৃত পাঁচ আঙুলবিশিষ্ট ‘শার্পাওয়েভ’ (SharpaWave) হাতকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই হাতের ২২টি মুভমেন্ট ডিগ্রি বা নমনীয়তা রয়েছে এবং এটি গিঁট বাঁধা কিংবা জিপলক ব্যাগ বন্ধ করার মতো সূক্ষ্ম কাজগুলিতে সফলভাবে পরীক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি, মডেলটি সাধারণ দুই-আঙুলের গ্রিপারগুলিও সমান দক্ষতায় পরিচালনা করতে পারে। ফ্রাঙ্কা ডুও (Franka Duo) সেটআপে রোবটগুলিকে অত্যন্ত সংকুচিত জায়গায় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে দেখা গেছে। মানুষের কাছে এই কাজগুলি সাধারণ মনে হলেও একটি মেশিনের ক্ষেত্রে এর জন্য অত্যন্ত সতর্ক প্রেশার, সঠিক সময়জ্ঞান এবং আঙুলের সঠিক অবস্থান অত্যন্ত জরুরি।

রিয়েল-টাইমে কাজের অগ্রগতি ট্র্যাক করবে এআই:
একটি রোবটের পক্ষে এটি জানা অত্যন্ত জরুরি যে সে কোনো কাজ সঠিকভাবে শেষ করেছে কি না। জেমিনি রোবটিক্স ইআর ২ মডেলটি অবিচ্ছিন্ন ভিডিও পর্যবেক্ষণ করে এবং কাজের অগ্রগতিকে পাঁচটি ভিন্ন ধাপে বিভক্ত করে। গুগলের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রোগ্রেস ক্লাসিফিকেশন বা কাজের অগ্রগতি মূল্যায়নের টেস্টে এটি ৫৭.৪ শতাংশ নির্ভুলতা দেখিয়েছে। এমনকি কোনো ঘটনা ঠিক কোন মুহূর্তে ঘটেছে তা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে মডেলটি ৯১.৩ শতাংশ নির্ভুলতা রেকর্ড করেছে, যেখানে গড় ত্রুটির পরিমাণ ছিল মাত্র ০.৯৬ সেকেন্ড। গুগলের দাবি, তাদের পরীক্ষিত অন্যান্য বৃহৎ মডেল ক্যাটাগরির তুলনায় এই প্রক্রিয়াটি চার গুণ দ্রুত গতিতে কাজ করে। রোবটটি যখন গতিশীল থাকে, তখনই এই মডেলটি তার পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করে নিতে পারে। এর ফলে মেশিন যখনই নতুন কোনো ধাপ প্রসেস করার জন্য হঠাৎ থেমে যায়, সেই অস্বস্তিকর বিরতিগুলি আর দেখতে হয় না।

এবার একসঙ্গে কাজ করতে পারবে একাধিক রোবট:
জেমিনি রোবটিক্স ২ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের রোবটের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি চাকার সাহায্যে চলা মেশিন ঘরের ভেতরের পরিবেশ পরিদর্শন করতে পারে এবং তারপর এমন কোনো হিউম্যানয়েড বা রোবটিক আর্মের কাছে কাজটি হস্তান্তর করতে পারে যা জিনিসপত্র ও ভারী বস্তু তোলার ক্ষেত্রে বেশি পটু। অ্যাপোলো ২ এবং ফ্রাঙ্কা এফ৩ ডুও (Franka F3 Duo) ব্যবহার করে এই পদ্ধতির সফল প্রদর্শন করেছে গুগল। এই যৌথ এআই সিস্টেমটি কাজটি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় এবং মেশিনগুলির মধ্যে কাজের সফল হ্যান্ডওভার ট্র্যাক করে।

নিরাপত্তা এখনো একটি অন্যতম বড় পরীক্ষা। রোবট যেন কোনো অনিরাপদ নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে, অসম্ভব কাজ চিনতে পারে এবং মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করতে পারে—তা পরিমাপ করার জন্য গুগল নিয়ে এসেছে ‘ASIMOV-Agentic’ বেঞ্চমার্ক। জেমিনি রোবটিক্স ইআর ২ মডেলটি খুব সহজেই আশেপাশের মানুষজনকে শনাক্ত করতে পারে এবং কোনো ব্যক্তি খুব কাছাকাছি চলে এলে হিউম্যানয়েড রোবটটিকে তৎক্ষণাৎ থামিয়ে দিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *