আইপিও বাজারে চরম বিপর্যয়! অর্ধেক দামেও মিলছে না ক্রেতা, সংকটে কুইক কমার্স জায়েন্ট জেপ্টো!

মাত্র ১০ মিনিটের হোম ডেলিভারির কুইক কমার্স বাজার বর্তমানে এক তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেখানে জেপ্টো তার আসন্ন আইপিও বা ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং নিয়ে একের পর এক জটিলতার মুখে পড়ছে, ঠিক অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা সুইগি এবং ইটার্নাল (জোমাটোর প্যারেন্ট কোম্পানি) দারুণ সাফল্যের সঙ্গে বাজারে নিজেদের অবস্থান মজবুত করে চলেছে। জেপ্টো যখন নতুন তহবিল সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই সুযোগেই সুইগি ও ইটার্নালের শেয়ার বাজারে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের জুলাই মাসটি এই দুই সংস্থার জন্যই বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক ও সফল মাস হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, জেপ্টোর হাতে থাকা নগদ অর্থ যদি দ্রুত ফুরিয়ে যায়, তবে কুইক কমার্সের বাজারে তাদের আধিপত্য বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

এই পুরো গল্পের আসল মোড় আসে যখন প্রধান বিনিয়োগকারীরা জেপ্টোর আইপিও-র মূল্যায়ন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন তহবিল ক্যালপার্স (CalPERS)-এর কাছ থেকে যখন জেপ্টো অর্থ সংগ্রহ করেছিল, তখন এর মূল্যায়ন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো; কোম্পানিটি যখন আইপিও আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দেশীয় মিউচুয়াল ফান্ড এবং প্রধান বিনিয়োগকারীরা সেই অতিমূল্যায়িত দাম দিতে জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। আর্থিক মহলে গুঞ্জন জোরালো হয়েছে যে, বর্তমানে এর মূল্যায়ন কমে ২.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে, যা তাদের আগের ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের চেয়ে অনেকটাই কম। মূলত কোম্পানির লাগাতার ও দ্রুত নগদ অর্থ খরচ করার প্রবণতাকেই বিনিয়োগকারীরা এক বড় বিপদ সংকেত হিসেবে দেখছেন।

শেয়ার বাজারের দীর্ঘকালীন নিয়ম অনুযায়ী, একজনের ক্ষতি বা সংকট প্রায়শই অন্যপক্ষের লাভ হয়ে ওঠে। জেপ্টোর বর্তমান দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই সুইগি এবং ইটার্নাল নিজেদের ব্যবসার গ্রাফ চাঙ্গা করে তুলেছে। জুলাই মাসে সুইগির শেয়ারের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৪ সালের নভেম্বরে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে তাদের সর্বকালের সেরা মাসিক পারফরম্যান্স। পাশাপাশি, ইটার্নালের শেয়ারের দামও ১৭ শতাংশ বেড়েছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্থান। জেপ্টোর আইপিও সংক্রান্ত এই অনিশ্চয়তা ও সংকটের আবহে সুইগি এবং ইটার্নালের সামনে নিজেদের বাজার দখল অনেকটাই বাড়িয়ে নেওয়ার সোনালী সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই তুমুল প্রতিযোগিতার দৌড়ে টাটা গ্রুপের বিগবাস্কেট এবং অ্যামাজন ইন্ডিয়াও নিজেদের জোরালো দাবি পেশ করে চলেছে।

এদিকে, গ্রে মার্কেট বা ধূসর বাজারেও জেপ্টোর শেয়ারের দরপতন স্পষ্ট। বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের নজর সম্পূর্ণভাবে জেপ্টোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে রয়েছে। কোম্পানিটি এখনও তাদের আইপিও আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল না করলেও, তাদের খসড়া আইপিও-র মেয়াদ আগামী ২১ আগস্ট শেষ হতে চলেছে। ফলে জেপ্টোর হাতে চিন্তাভাবনা করার জন্য অত্যন্ত কম সময় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাদের সামনে তিনটি পথ খোলা—হয় কম মূল্যায়নে রাজি হওয়া, নয়তো ইস্যুর আকার ছোট করা, কিংবা পুরো তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়াটিই সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা। এই চরম অনিশ্চয়তার জেরে গ্রে মার্কেটে জেপ্টোর শেয়ারের দাম ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক এই ওলটপালট কুইক কমার্স ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। এসমোরের সিআইও রাশি তালওয়ার ভাটিয়া মনে করেন, তীব্র নগদ অর্থের সংকটের কারণে জেপ্টোকে বাধ্য হয়েই তাদের খরচ ও অপারেশনাল বাজেট কমাতে হবে। এর ফলে তাদের কোম্পানির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বা গ্রোথ মারাত্মকভাবে মন্থর হয়ে পড়বে এবং এর সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা সুইগি। তাছাড়া, বিশিষ্ট ব্রোকারেজ ফার্ম নোমুরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সুইগির কুইক কমার্স শাখা অর্থাৎ ‘ইনস্টামার্ট’ ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত লোকসানের মুখে থাকতে পারে ঠিকই, তবে তাদের মূল ফুড ডেলিভারি ব্যবসার শক্তিশালী মুনাফা দিয়েই তারা এই প্রাথমিক ক্ষতি অনায়াসে পুষিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *