প্লেনের জানলা কেন সবসময় গোলই হয়? আসল রহস্য জানলে চমকে যাবেন!

আকাশে ওড়ার সময় বিমানের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মেঘ দেখার আনন্দই আলাদা। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, ঘরের বা বাসের জানলার মতো প্লেনের জানলা চারকোনা না হয়ে সর্বদা গোল বা ডিম্বাকৃতি হয় কেন? শুনতে অবাক লাগলেও, ১৯৫০-এর দশকে কিন্তু বাণিজ্যিক বিমানগুলিতে চারকোনা বা চারটে কোণযুক্ত জানলাই ব্যবহার করা হতো। সেই সময় বিমানগুলি তুলনামূলক কম উচ্চতায় এবং কম গতিতে চলত, যার ফলে বিমানের অভ্যন্তরীণ বাতাস এবং বাইরের বায়ুমণ্ডলের চাপের মধ্যে খুব একটা তফাত হতো না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয় করতে এবং গতি বাড়াতে বিমানগুলি অনেক বেশি উচ্চতায় উড়তে শুরু করে। অতিরিক্ত উঁচুতে বাতাসের চাপ অত্যন্ত কমে যাওয়ায় বিমানের ভেতরের যাত্রীদের সুরক্ষায় কৃত্রিম চাপ বা কেবিন প্রেশারাইজ করা বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। কেবিনের ভেتরের এই প্রবল কৃত্রিম চাপ ক্রমাগত বিমানের কাঠামোর ওপর ধাক্কা দিতে থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই পরিস্থিতিতে চারকোনা জানলা থাকলে কেবিনের সমস্ত চাপ গিয়ে জমা হয় জানলার চারটি তীক্ষ্ণ কোণে, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘স্ট্রেস কনসেন্ট্রেশন’ বলা হয়।
এই ত্রুটির কারণে ১৯৫৩ এবং ১৯৫৪ সালে বিশ্বের প্রথম কমার্শিয়াল জেট বিমান ‘ডি হ্যাভিল্যান্ড কমেট’ পরপর কিছু মারাত্মক দুর্ঘটনার মুখে পড়ে এবং মাঝ আকাশে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তদন্তে উঠে আসে শিহরণ জাগানো তথ্য। তদন্তকারীরা দেখতে পান, চারকোনা জানলার তীক্ষ্ণ কোণগুলিতে কেবিনের অতিরিক্ত চাপের কারণে ধাতুর গায়ে সূক্ষ্ম ফাটল ধরেছিল। বিমান ওড়ার সময় বারবার কেবিনের চাপ বৃদ্ধি ও হ্রাসের ফলে সেই ফাটলগুলি আস্তে আস্তে বড় হয়ে পুরো বিমান ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিমান প্রস্তুতকারক ইঞ্জিনিয়াররা ডিজাইনে বড় পরিবর্তন আনেন। চারকোনা জানলার বদলে তা পুরোপুরি গোল বা ডিম্বাকৃতি করা হয়, যাতে চাপের তীব্রতা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে আটকে না থেকে পুরো জানলার ফ্রেমে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মূলত বৃত্তাকার বা কার্ভ ডিজাইনের কারণে জানলায় কোনো দুর্বল বিন্দু বা ‘স্ট্রেস পয়েন্ট’ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই স্রেফ দেখতে সুন্দর লাগার জন্য নয়, বরং মাঝ আকাশে হাজার হাজার ফুট উঁচুতে যাত্রীদের জীবন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে বিমানের এই গোল নকশা এক অপরিহার্য সুরক্ষা কবচ।